আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা পূর্ব ইউক্রেনের লুহানস্ক অঞ্চলের স্টারোবিলস্ক শহরে একটি কলেজ হোস্টেলে ভয়াবহ ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত শুক্রবার (২২ মে) রাতের এই হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৪২ জন আহত হয়েছেন বলে রাশিয়ার জরুরি পরিস্থিতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে। নিহতদের মধ্যে বেশির ভাগই ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, হামলার শিকার ভবনটি লুহানস্ক পেডাগোগিক্যাল ইউনিভার্সিটির অধিভুক্ত স্টারোবিলস্ক প্রফেশনাল কলেজের পাঁচতলা ছাত্রাবাস ছিল। তিনটি দফায় মোট ১৬টি আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে এই হামলা চালানো হয়, যার ফলে ভবনটির ওপরের তিনটি তলা সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। ঘটনার সময় ভবনটিতে প্রায় ৮৬ জন কিশোর শিক্ষার্থী ও শিক্ষক অবস্থান করছিলেন। গত শনিবার গভীর রাত পর্যন্ত স্থানীয় উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে জীবিত ও মরদেহ উদ্ধারে ব্যাপক তৎপরতা চালায়। ওলগা কোভালেভা নামে ২১ বছর বয়সী এক কলেজ শিক্ষার্থী হাসপাতাল থেকে জানান, হামলার পর তিনি দীর্ঘ সময় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা ছিলেন, পরে উদ্ধারকারীরা তাকে উদ্ধার করেন।
এই হামলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি এটিকে একটি ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে অভিহিত করেন। পুতিন দাবি করেন, ধসে পড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির আশেপাশে কোনো সামরিক বা গোয়েন্দা ঘাঁটি ছিল না। ফলে ইউক্রেনীয় বাহিনী ভুলবশত বা বিমান প্রতিরক্ষার কারণে এই ভবনে আঘাত করেছে—এমন দাবি করার কোনো সুযোগ নেই। এই হামলার কঠোর জবাব দিতে তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় রণকৌশল ও পাল্টা আক্রমণের প্রস্তাব তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। ক্রেমলিনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ কেউ এই ঘটনার জন্য ইউক্রেনের পাশাপাশি তাদের পশ্চিমা সহযোগীদের ওপরও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন।
অন্য দিকে, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী বেসামরিক স্থাপনায় হামলার এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ এক বিবৃতিতে জানান, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও যুদ্ধনীতি কঠোরভাবে মেনে তারা কেবল শত্রুপক্ষের সামরিক অবকাঠামোতেই আঘাত হানেন। কিইভের দাবি, তাদের বাহিনী ওই রাতে স্টারোবিলস্কে বেসামরিক কোনো ভবনে নয়, বরং রাশিয়ার ড্রোন চালনাকারী একটি বিশেষ এলিট ইউনিট ‘রুবিকন’-এর সদর দপ্তরে সফল অভিযান চালিয়েছে। এই ঘটনাকে রাশিয়া নিজেদের প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচারের অংশ হিসেবে ব্যবহার করছে বলেও কিইভ পাল্টা অভিযোগ করেছে।
এই রক্তক্ষয়ী হামলা ও পাল্টাপাল্টি দাবির প্রেক্ষিতে রাশিয়ার অনুরোধে গত শুক্রবারই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে রাশিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি ধ্বংসপ্রাপ্ত কলেজের চিত্র ও আলোকচিত্র প্রদর্শন করে এটিকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিন্দা জানানোর আহ্বান জানান। এর জবাবে ডেনমার্কসহ পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিনিধিরা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। ডেনমার্কের প্রতিনিধি উল্লেখ করেন, রাশিয়া প্রতিদিন ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর ও বেসামরিক জনগণের ওপর যে ব্যাপক বোমাবাজি ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, তার জবাবদিহিতার জন্য প্রতি সপ্তাহে একাধিকবার নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকা উচিত। জাতিসংঘ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেও রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত ওই অঞ্চলে সরাসরি প্রবেশাধিকার না থাকায় ঘটনার নিরপেক্ষ সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি। এই হামলার পর দুই দেশের মধ্যকার যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।


