অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার বিদ্যমান বিশাল বাণিজ্যঘাটতি কমানো এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে ১৯ বিলিয়ন ডলারই চীনের অনুকূলে। বিপরীতে, বাংলাদেশের রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলারেরও কম। চীন বাংলাদেশকে শতভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার পরও এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সফরে বাণিজ্যঘাটতি হ্রাস, এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্রমতে, এই সফরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, জ্বালানি ও প্রযুক্তি সহযোগিতা-সংক্রান্ত ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হতে পারে।
এফটিএ আলোচনা ও এলডিসি উত্তরণ চ্যালেঞ্জ
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে উত্তরণের পর চীনের বাজারে বর্তমানের শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা আর বহাল থাকবে না। এই বাণিজ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে এফটিএ-র যৌক্তিকতা যাচাইয়ে একটি যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে এই সমীক্ষা প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যে প্রত্যক্ষ বা ভৌত আলোচনা শুরু করার বিষয়ে বড় ধরনের অগ্রগতি হতে পারে।
কৃষিপণ্য রপ্তানি ও নতুন প্রোটোকল
বাংলাদেশের কৃষি খাতের জন্য এই সফরের একটি অন্যতম বড় সম্ভাব্য অর্জন হতে পারে চীনের বিশাল বাজারে তাজা আম ও কাঁঠাল রপ্তানির দ্বিপক্ষীয় প্রোটোকল স্বাক্ষর। চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস সম্প্রতি বাংলাদেশি তাজা আম আমদানির ফাইটোস্যানিটারি (উদ্ভিদ স্বাস্থ্যবিষয়ক) প্রয়োজনীয়তা অনুমোদন করেছে। সফরে এই প্রোটোকলটি চূড়ান্ত ও কার্যকর হলে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের নীতিপ্রাধান্য কর্মকর্তারা।
বিনিয়োগ, ব্যাংকিং ও অবকাঠামো উন্নয়ন
পণ্য রপ্তানির পাশাপাশি বাংলাদেশে সেবা খাতে চীনা বিনিয়োগ বাড়িয়ে বাণিজ্য ভারসাম্য আনার কৌশল নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামে আনোয়ারায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পর এবার মোংলায় দ্বিতীয় একটি চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে এই সফরে বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া, ডিজিটাল অর্থনীতি ও তথ্য-প্রযুক্তিতে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ জোরদারে বিশেষ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেন ও মুদ্রা বিনিময় সহজতর করতে বাংলাদেশে চীনা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব এবং উভয় দেশের কেন্দ্রীয় আর্থিক নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার মধ্যে ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সংস্কারের জন্য একটি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি, চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু সংস্কার ও নতুন নবম মৈত্রী সেতু নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে দুই দেশের মধ্যে লেটার অব এক্সচেঞ্জ (এলওই) বিনিময় হতে পারে।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সহযোগিতা
দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে চীনের উচ্চপর্যায়ের সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার এজেন্ডা রয়েছে। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই)-এ যুক্ত হতে সমঝোতা স্মারক সই করতে পারে। এছাড়া বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক জোট ব্রিকস (BRICS) এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট আরসিইপি (RCEP)-তে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে চীনের নীতিগত ও কৌশলগত সমর্থন চাওয়া হবে।
ব্যবসায়িক মহলের প্রস্তাবনা
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য খাতের অংশীজনদের মতে, শুল্কমুক্ত সুবিধার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং চীনের বাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করতে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। এই সফরকে কেন্দ্র করে বেসরকারি খাত থেকে চীনের প্রধান শহরগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য ৩০টি স্থায়ী আউটলেট স্থাপন, চীনা প্রযুক্তির প্রসারে বাংলাদেশে ২০টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা এবং দুই দেশের মুদ্রা বিনিময় সহজ করতে ডেডিকেটেড ব্যাংক চালুর প্রস্তাবনা উত্থাপন করা হয়েছে। অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নের সহজ শর্ত নিশ্চিত করতে চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আলোচনার কথা রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।


