অপরাধ ডেস্ক
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ এলাকায় ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরামসহ ছয়জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ ২২ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমলে নিয়ে এই আদেশ প্রদান করেন। এর আগে গত ২২ জুন প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে আদালতে ২২ আসামির বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের ভিত্তি (প্রাইমা ফেসি গ্রাউন্ড) রয়েছে উল্লেখ করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আবেদন জানানো হয়েছিল। রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল আজ অভিযোগ গঠনের এই দিন ধার্য করেছিলেন।
মামলার বিবরণ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশব্যাপী চলমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তথা জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে চট্টগ্রামে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানা এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের যৌথ হামলার ঘটনা ঘটে। এতে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক ওয়াসিম আকরামসহ মোট ছয়জন নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের পর সংশ্লিষ্ট থানায় এবং পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনালে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়। তদন্ত শেষে প্রসিকিউশন আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পায়।
আদালত সূত্র জানায়, অভিযোগ গঠনের আদেশ প্রদানের পূর্বে মামলার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শোনেন ট্রাইব্যুনাল। গত সোমবার টানা তৃতীয় দিনের মতো আসামিপক্ষে আইনি শুনানি পরিচালনা করেন আইনজীবী মিজানুর রহমান। একই সঙ্গে মামলার অন্যতম আসামি চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর পক্ষে জামিন ও অব্যাহতি চেয়ে শুনানি করেন আইনজীবী আবদুল কাইয়ুম। এর আগে গত ২৮ জুন ফজলে করিমের অব্যাহতি চেয়ে যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়েছিল। অন্যদিকে, মামলায় যারা পলাতক রয়েছেন, তাদের আইনগত অধিকার রক্ষার্থে রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া ডিফেন্স আইনজীবী মো. আমির হোসেন, আবুল হাসান, ইশরাত জাহান ও মোহাম্মদ এনাম গত ২৪ জুন নিজ নিজ মক্কেলের পক্ষে শুনানি সম্পন্ন করেন।
মঙ্গলবার শুনানির সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, আবদুস সোবহান তরফদার, ফারুক আহাম্মদ এবং জহিরুল আমিনসহ ঊর্ধ্বতন আইনজীবীরা। তারা আসামিদের বিরুদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধ ও সুনির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডের অভিযোগগুলো আদালতে তুলে ধরেন এবং বিচার শুরুর জোর দাবি জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই মামলায় এজাহারনামীয় মোট ২২ জন আসামির মধ্যে বর্তমানে পাঁচজন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন— সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরী, যুবলীগ নেতা আজিজুর রহমান, তৌহিদুল ইসলাম, মো. ফিরোজ এবং দেবাশীষ পাল দেবু। মঙ্গলবার কারাকর্তৃপক্ষ কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ফজলে করিম চৌধুরী ছাড়া বাকি চার আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে।
অন্যদিকে, মামলার প্রধান দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ ১৭ জন আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন। পলাতক অপর আসামিরা হলেন— চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাসির উদ্দীন, সাবেক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চু, হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, যুবলীগ নেতা নুরুল আজিম রনি, শৈবাল দাশ সুমন, আবু ছালেক, এসবারুল হক, এইচ এম মিঠু, নূর মোস্তফা টিনু, জমির উদ্দিন, ইমরান হাসান মাহমুদ, জাকারিয়া দস্তগীর, মহিউদ্দিন ফরহাদ ও সুমন দে। পলাতক আসামিদের অনুপস্থিতিতেই ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন।
আইনজ্ঞদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় এই আদেশটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই মামলাটির আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হওয়ায় জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দ্রুত ন্যায়বিচার পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আদালত আগামী কার্যদিবসে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করবেন।


