আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর রাজনৈতিক উপপ্রধান ও মুখপাত্র মোহাম্মদ আকবারজাদেহ এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কেরমান প্রদেশে এই দুর্ঘটনা ঘটে। ইরানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে এই দুর্ঘটনার কারণ ও পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদ আকবারজাদেহ ইয়াজদ অঞ্চল থেকে কেরমান প্রদেশের দিকে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে তার গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক থেকে উল্টে যায়। দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকারীরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে নিকটবর্তী একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যান। তবে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মোহাম্মদ আকবারজাদেহ আইআরজিসি নৌবাহিনীর অন্যতম একজন জ্যেষ্ঠ এবং প্রভাবশালী কর্মকর্তা ছিলেন। রাজনৈতিক উপপ্রধান ও প্রধান মুখপাত্র হিসেবে তিনি নিয়মিত আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতেন। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ব্যবস্থা, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে ইরানের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং আইআরজিসি নৌবাহিনীর কৌশলগত প্রস্তুতি ও সক্ষমতা নিয়ে তিনি প্রায়শই ইরানের রাষ্ট্রীয় নীতি ও বক্তব্য প্রকাশ্যে তুলে ধরতেন। উল্লেখ্য, চলতি বছরের শুরুর দিকে হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌচলাচলে বাধা সৃষ্টির অভিযোগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তার ওপর বিশেষ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
তার এই আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনাটি এমন এক সংবেদনশীল সময়ে ঘটল, যখন মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা নতুন করে চরম আকার ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হরমুজ প্রণালির নিকটবর্তী জলসীমায় আন্তর্জাতিক তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা, আইআরজিসির উপকূলীয় নৌঘাঁটি, সামরিক স্থাপনা এবং ড্রোন হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে নৌবাহিনীর একজন শীর্ষ কর্মকর্তার মৃত্যু ইরানের সামরিক কমান্ডের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে আকবারজাদেহর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনের কিছু সামরিক বিশ্লেষক এবং ইরান সরকারের বিরোধীপন্থী বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে এই ঘটনার সময়কাল ও পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করা হয়েছে। কোনো কোনো মহলের দাবি, এই মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো কারণ বা হামলা থাকতে পারে, যা এড়ানোর জন্য সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। তাদের মতে, কোনো জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা যদি প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হন, তবে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বড় ধরনের সামরিক জবাব দেওয়ার চাপ তৈরি হয়। একই সাথে এটি বাহিনীর কোনো দুর্বলতা প্রকাশ করতে পারে, যা এড়াতেই রাষ্ট্রীয়ভাবে এটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করার কৌশল নেওয়া হতে পারে বলে সমালোচকরা অতীতেও বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে অভিযোগ তুলেছেন।
তবে এই ধরনের দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত স্বাধীন বা নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাও এই মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো শক্তির সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। ইরান সরকারের পক্ষ থেকেও সড়ক দুর্ঘটনার যে সরকারি বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তার বাইরে অন্য কোনো ধরনের মন্তব্য বা ভিন্ন কোনো ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়নি। ফলে সামগ্রিক পরিস্থিতিতে এটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবেই এখনো পর্যন্ত বিবেচিত হচ্ছে।


