শিক্ষা ও জাতীয় সংসদ ডেস্ক
মাদ্রাসাসহ দেশের সকল বেতন বঞ্চিত শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান হতে যাচ্ছে আগামী জুলাই মাসেই। বকেয়াসহ নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে এই সংকট দূর করার সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই তথ্য নিশ্চিত করেন। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইআইবি) অধিভুক্ত ফাজিল ও কামিল স্তরের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কৃতি শিক্ষার্থীদের ‘অ্যাওয়ার্ড প্রদান’ উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
শিক্ষামন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে দেশের মাদ্রাসা শিক্ষা ও সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনীয়তার নিরিখে ১৭ হাজার নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও তৎকালীন বাজেটে তাদের বেতন-ভাতার জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর দেখা যায়, এই শিক্ষকদের বেতনের জন্য প্রায় ৫০১ কোটি টাকার প্রয়োজন, যার কোনো তহবিল পূর্ববর্তী বাজেটে ছিল না। শুধু ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনের জন্যই ২৯ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ নিয়েছে এবং আগামী জুলাই মাস থেকেই এই শিক্ষকদের নিয়মিত বেতন নিশ্চিত করার পাশাপাশি বকেয়া পরিশোধের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং একে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ইসলামি শিক্ষাকে কোনো নির্দিষ্ট দল বা মতাদর্শের হাতিয়ার হতে দেবে না সরকার। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বর্তমান প্রশাসন সম্পূর্ণ সংকল্পবদ্ধ। জাতীয় নির্বাচনের পর এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একযোগে সাতজন কর্মকর্তার পদত্যাগের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি জানান, প্রশাসনিক তদন্তে দেখা গেছে পদত্যাগকারীদের ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ কাম্য নয় এবং মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হবে।
প্রাথমিক স্তরের মাদ্রাসা বা ইবতেদায়ী মাদ্রাসার এমপিওভুক্তি (মান্থলি পে-অর্ডার) নিয়ে চলমান অসন্তোষের বিষয়েও কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, নিয়মানুযায়ী ৩৫ শতক জমি এবং এনটিআরসিএ (বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ) থেকে শিক্ষক নিবন্ধনের শর্তে ইবতেদায়ী মাদ্রাসাগুলোর এমপিওভুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে শর্ত শিথিল করে ২৩ শতক জমিতে প্রতিষ্ঠান নির্মাণের সুযোগ দেয়। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) থেকে দেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক কোড নম্বরগুলোর কোনো সঠিক মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন বা যাচাই-বাছাই করা হয়নি। ফলে দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান শিক্ষা প্রশাসন এক ধরনের বিশৃঙ্খল ও অনিয়মতান্ত্রিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। তবে সরকার এই ত্রুটিগুলো দূর করে একটি স্বচ্ছ ও টেকসই নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে।
কওমি শিক্ষা ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ সংকট প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, কওমি ধারার শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের কারণে সরকারের পক্ষে তাদের সার্বিক উন্নয়ন ও সংস্কার প্রক্রিয়া গুছিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে। তা সত্ত্বেও দেশের সামগ্রিক মাদ্রাসা শিক্ষাকে মূলধারার সমকক্ষ ও যুগোপযোগী করতে সরকার সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিত প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, দেশের বিভিন্ন কামিল ও ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এবং কৃতি শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষাবিদদের মতে, জুলাই মাসে শিক্ষকদের বেতন প্রাপ্তির এই ঘোষণা দেশের বেসরকারি ও মাদ্রাসা শিক্ষা খাতে চলমান আর্থিক অনিশ্চয়তা দূর করতে এবং শিক্ষা কার্যক্রমে স্থীতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।


