খেলাপি ঋণ কমাতে সুদ মওকুফের বড় সুযোগ দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

খেলাপি ঋণ কমাতে সুদ মওকুফের বড় সুযোগ দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক

২০২৪ সাল থেকে বিশেষ পুনঃতফসিল নীতির আওতায় নিয়মিত হওয়া অধিকাংশ ঋণ আবারও খেলাপি হয়ে পড়ায় ঋণগ্রহীতাদের জন্য বড় ধরনের সুদ মওকুফের সুযোগ চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত সোমবার জারি করা এক সার্কুলারে, ব্যাংকগুলোকে ঋণ গ্রাহকদের আরোপিত (চার্জড) ও অনারোপিত (আনচার্জড) উভয় ধরনের সুদ মওকুফের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সুদ মওকুফের আগে তহবিল খরচ আদায়ের পূর্ববর্তী বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হলো। মন্দ ঋণ চিরতরে মুছে ফেলে ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট সংহত করতে এবং খেলাপিদের ঋণমুক্ত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই কৌশল নিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর স্থগিত সুদ হিসাবে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার অনারোপিত সুদ জমেছিল। নতুন নির্দেশনায়, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত যারা বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা পেয়েছেন, তারাও এই সুদ মওকুফের যোগ্য হবেন। এই নীতিমালার আওতায় খেলাপিরা কেবল ঋণের আসল বা প্রিন্সিপাল অংশ পরিশোধ করে এককালীন নিষ্পত্তির সুযোগ পাবেন। এতে ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপি ঋণের হার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০.৬০ শতাংশ থেকে কমে ২৫ শতাংশে নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যখন কোনো ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ের পর পেমেন্ট বন্ধ করে দেন, তখন সেই ঋণটি নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) বা খেলাপি ঋণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। ব্যাংককে তখন এই ঋণের অনাদায়ী সুদকে লাভ হিসেবে দেখানো বন্ধ করে একটি সাময়িক হিসাব বা ‘স্থগিত সুদ হিসাবে’ (সাসপেন্স অ্যাকাউন্ট) জমা রাখতে হয়। সার্কুলার জারির আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকে ব্যালেন্স শিটের খেলাপি ঋণ কমাতে আসল ও সুদ মওকুফের বিকল্প নিয়ে আলোচনা করেন। ব্যাংকগুলো ব্যাংক কোম্পানি আইনের পরিপন্থী হওয়ায় আসল মওকুফের বিরোধিতা করলেও স্থগিত সুদ মওকুফের বিকল্পটি মেনে নিয়েছে। তবে আরোপিত সুদ মওকুফের বিষয়টি কেস-বাই-কেস বিবেচনা করা হবে, কারণ এটি ২০২৬ সালে ব্যাংকের আয় সরাসরি কমিয়ে দিতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে আগামী ঋণ কর্মসূচির বৈঠকের আগে খেলাপি ঋণের হার কমিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে খেলাপি, পুনঃতফসিল ও অবলোপন করা ঋণসহ দেশের মোট ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০.৮৭ লাখ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬০ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, “আমানতকারীদের টাকা ক্ষমা করার অধিকার কারও নেই। সুদ মওকুফের অনুমতি দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত অনৈতিক এবং এটি খেলাপিদের আরও বেশি উৎসাহিত করবে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মুহাম্মদ এ (রুমি) আলী বলেন, “বড় মন্দ ঋণের ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ সুদ মওকুফ করা হলে ব্যাংকের আয় ও মূলধন পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা ব্যাংকের সক্ষমতা ও আমানতকারীদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।” তিনি কর ব্যবস্থার অস্পষ্টতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ব্যাংকগুলো ইতিমধ্যে যে সুদ আয়ের ওপর ট্যাক্স দিয়ে দিয়েছে, তা মওকুফ হলে কোনো কর সমন্বয় পাবে কিনা তা পরিষ্কার নয়। এছাড়া তিনি বড় খেলাপিদের সম্পদ আইনি প্রক্রিয়ায় এনে ঋণ আদায়ের তাগিদ দেন।

বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের মতে, স্থগিত সুদের বিপরীতে প্রভিশন রাখা থাকলে মুনাফায় বড় প্রভাব পড়বে না, তবে প্রভিশন না থাকলে মুনাফা কমবে। ব্যাংকগুলোর মতে, বারবার ঋণ পুনঃতফসিল করা স্থায়ী সমাধান নয়। ব্যাংকিং খাতের টেকসই সমাধানের জন্য একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠন করা প্রয়োজন, যা ছাড়কৃত মূল্যে সংকটাপন্ন সম্পদ কিনে ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করতে সাহায্য করবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো ২.৫৬ লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ পুনঃতফসিল করলেও তার ৪০ শতাংশই আবার খেলাপি হয়ে গেছে। খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, খেলাপি কোম্পানিগুলোর ঋণ-ইকুইটি অনুপাত ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় তাদের কোনো মূলধন ছিল না। এই মূল সমস্যা সমাধান না করে পুনঃতফসিল ও গ্রেস পিরিয়ড দেওয়ার ফলে দায়ের বোঝা আরও বেড়েছে এবং ঋণগ্রহীতারা পুনরায় খেলাপি হয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢালাও সুবিধার পরিবর্তে সম্পদ বিক্রি বা বন্ধক রেখে ব্যবসা ছোট করার মতো কঠোর পদক্ষেপই ঋণ আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ