অনলাইন জুয়া ও ক্রিপ্টো বেটিং রোধে ৫ কোটি টাকা জরিমানার বিধান রেখে নতুন আইন পাস

অনলাইন জুয়া ও ক্রিপ্টো বেটিং রোধে ৫ কোটি টাকা জরিমানার বিধান রেখে নতুন আইন পাস

জাতীয় সংসদ ডেস্ক

ডিজিটাল যুগের অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ভিত্তিক আর্থিক অপরাধ রোধে জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিতে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন-২০২৬’ পাস হয়েছে। নতুন এই আইনে অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ১৫৯ বছরের পুরোনো ব্রিটিশ আমলের আইনি কাঠামো বাতিল করে এই যুগোপযোগী ও কঠোর আইনটি প্রণয়ন করা হলো।

গতকাল স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৯তম কার্যদিবসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। এর পরপরই ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) বিল-২০২৬’ পাসের প্রস্তাব করলে সেটিও সংসদে সর্বসম্মতিতে পাস হয়।

পাস হওয়া জুয়া প্রতিরোধ বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ১৮৬৭ সালের ‘দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট’ দীর্ঘ দেড় শতাধিক বছর পুরোনো হওয়ায় আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত জুয়া ও বেটিং প্রতিরোধে সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। বর্তমানে অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্ম, ভিপিএন (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক), সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভুয়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট এবং ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহার করে ব্যাপক হারে জুয়া, অর্থ পাচার ও প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। এসব অপরাধ দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং তরুণ সমাজের মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের ক্ষেত্রে গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই পুরোনো আইনটি রহিত করে কঠোর সাজার বিধানসহ নতুন আইনটি কার্যকর করা হলো।

নতুন এই আইনে ডিজিটাল অপরাধের পরিধি বিবেচনায় ‘অনলাইন জুয়া বা দূরবর্তী জুয়া’, ‘অনলাইন বেটিং’ (স্পোর্টস বেটিং, লাইভ বেটিং ও ক্যাসিনো বেটিং), ‘ক্রিপ্টোকারেন্সি’, ‘ঘোস্ট সিম’ এবং ‘ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট’ বা ডিজিটাল ওয়ালেটের সুনির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে।

আইনের ধারা অনুযায়ী, জুয়ার উদ্দেশ্যে যেকোনো মাধ্যমে অর্থ জমা, উত্তোলন বা স্থানান্তর করা, বিদেশি কোনো অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্মের দেশীয় প্রতিনিধি বা এজেন্ট হিসেবে কাজ করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুয়া সংক্রান্ত পেজ, গ্রুপ বা চ্যানেল পরিচালনা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ছাড়া জুয়ার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা সরঞ্জাম সরবরাহ, জুয়ার বিজ্ঞাপন প্রচার এবং স্পনসরশিপের ক্ষেত্রেও সমানভাবে কঠোর কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আইনে অপরাধের মাত্রাভেদে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং অনধিক ৫ কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এই আইনের অধীন সংঘটিত সব অপরাধকে ‘আমলযোগ্য’ (কগনিজ্যাবল) এবং ‘অজামিনযোগ্য’ (নন-বেলেবল) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যার বিচার দেশের সাইবার ট্রাইব্যুনাল বা ক্ষেত্রবিশেষে মোবাইল কোর্টের আওতায় পরিচালিত হবে।

এদিকে, একই অপরাধের আইনি ওভারল্যাপিং বা জটিলতা এড়াতে সংসদে ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন-২০২৬’ পাস করা হয়েছে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে মূল সাইবার সুরক্ষা আইনের ২০ ধারাটি বিলুপ্ত করা হয়েছে, যেখানে ডিজিটাল জুয়ার অপরাধে ১ কোটি টাকা জরিমানার বিধান ছিল।

সংশোধনী বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, দেশের সাইবার স্পেসকে নিরাপদ রাখতে মূল আইনটি করা হলেও বর্তমান বাস্তবতায় ডিজিটাল ও অফলাইন জুয়া এবং বেটিং সংক্রান্ত অপরাধগুলো আরও কঠোরভাবে দমনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন-২০২৬’ নামে একটি স্বতন্ত্র, সুনির্দিষ্ট এবং বিস্তারিত বিশেষায়িত আইন প্রণয়ন করায় সাইবার সুরক্ষা আইন থেকে এই ধারাটি প্রত্যাহার করা হলো। এর ফলে একই অপরাধের জন্য একাধিক আইনের প্রয়োগজনিত আইনি জটিলতা নিরসন হবে। সংশোধনীতে উল্লেখ করা হয়েছে, এই আইনটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।

আইন আদালত শীর্ষ সংবাদ