খেলাধূলা ডেস্ক
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা ফুটবলীয় উন্মাদনার কেন্দ্রবিন্দু হলেও, ঐতিহাসিক এবং কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ আমেরিকার এই দুই পরাশক্তির গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের পর যে রাষ্ট্রগুলো নবীন বাংলাদেশকে প্রথম সারিতে থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছিল, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা তাদের অন্যতম। ১৯৭২ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠিত সেই কূটনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বর্তমানে বাণিজ্য, কূটনীতি এবং সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে।
ঐতিহাসিক নথিপত্র অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৫ মে ব্রাজিল আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। দেশটির রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্যমতে, ওই বছর থেকেই দুই দেশের মধ্যকার আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা হয়। এর ঠিক দশ দিন পর, ১৯৭২ সালের ২৫ মে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় আর্জেন্টিনা। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের একটি যৌথ ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা আর্জেন্টিনার সরকারি ডিক্রিতে স্প্যানিশ ভাষায় সংরক্ষিত রয়েছে।
কূটনৈতিক সম্পর্কের এই দীর্ঘ যাত্রায় ১৯৭৮ সালে ঢাকায় আর্জেন্টিনার দূতাবাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে একটি সাময়িক শূন্যতার তৈরি হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে আর্জেন্টিনার ফুটবল দলের প্রতি বাংলাদেশি সমর্থকদের অভূতপূর্ব উন্মাদনা ও আবেগ বিশ্বব্যাপী নজর কাড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ ৪৫ বছর পর, ২০২৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুনরায় পূর্ণাঙ্গ আর্জেন্টাইন দূতাবাস চালু করা হয়, যা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভৌগোলিক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসারে দুই দেশের ক্রীড়াবিদ ও জনগণের মধ্যে একটি নিবিড় আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়েছে। ব্রাজিলের গোলকিপার আলিসন বেকার, কাসেমিরো এবং আর্জেন্টিনার গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেজের মতো বৈশ্বিক তারকারা বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশি সমর্থকদের প্রতি তাঁদের গভীর কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসাকেও স্থানীয় সমর্থকদের সাথে খেলা উপভোগ ও উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে, যা জনগণের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও জোরদার করেছে।
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও দক্ষিণ আমেরিকার এই দুই দেশের সাথে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব দিন দিন দৃঢ় হচ্ছে। বর্তমান বাণিজ্যিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আর্জেন্টিনার তুলনায় ব্রাজিলের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ আর্জেন্টিনার চেয়ে প্রায় আট গুণ বেশি। একইভাবে আমদানির ক্ষেত্রেও ব্রাজিলের অবস্থান বেশ সুবিধাজনক। দুই দেশেই বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হিসেবে শীর্ষস্থান দখল করে আছে তৈরি পোশাক (আরএমজি)।
সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ দুই দেশের সাথে সম্পর্ককে আরও গতিশীল করেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) একটি সাইডলাইন বৈঠকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশ সফরের তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করেন। এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের সফর এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনা আগামী দিনে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শুল্ক জটিলতা নিরসন এবং দক্ষিণ আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য জোট ‘মারকোসুর’-এর সাথে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব বাড়াতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।


