ক্রীড়া ডেস্ক
চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের হাইভোল্টেজ ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছে পর্তুগাল। তবে শ্বাসরুদ্ধকর এই জয়ের পর ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে ম্যাচসেরা নির্বাচনের সিদ্ধান্ত। ম্যাচে পেনাল্টি থেকে সমতাসূচক গোল করা পর্তুগিজ অধিনায়ক ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ ঘোষণা করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিলক্ষিত হয়। আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে ঠাসা ম্যাচের প্রথমার্ধে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো একবার বল ক্রোয়েশিয়ার জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে রেফারি তা বাতিল ঘোষণা করেন। ফলস্বরূপ প্রথমার্ধের খেলা গোলশূন্যভাবেই শেষ হয়। দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের গতি আরও বৃদ্ধি পায়। খেলার ৬৮তম মিনিটে পর্তুগাল একটি পেনাল্টি লাভ করলে তা থেকে নিখুঁত শটে গোল করে দলকে সমতায় ফেরান রোনালদো। এটি আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই স্ট্রাইকারের ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের ক্যারিয়ারে প্রথম গোল। একই সাথে চলতি বিশ্বকাপে এটি তার তৃতীয় ব্যক্তিগত গোল হিসেবে নথিবদ্ধ হয়।
তবে গোল করলেও ম্যাচের বাকি সময় জুড়ে মাঠের পারফরম্যান্সে রোনালদো খুব একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি বলে মত বিশ্লেষকদের। ম্যাচের ৮১তম মিনিটে পর্তুগালের প্রধান কোচ রবার্তো মার্টিনেজ কৌশলগত কারণে অধিনায়ক রোনালদোকে মাঠ থেকে তুলে নেন। মাঠ ছাড়ার সময় পর্তুগিজ এই মহাতারকার চোখে-মুখে স্পষ্ট বিরক্তির বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়, যা ম্যাচ চলাকালীন সময়ে ক্যামেরায় ধরা পড়ে।
রোনালদো মাঠ ছাড়ার পর ম্যাচের নাটকীয়তা আরও বাড়ে। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষে যখন ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর আভাস দিচ্ছিল, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আসেন পর্তুগালের তরুণ ফরোয়ার্ড গনসালো রামোস। ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে (ইঞ্জুরি টাইম) বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে দুর্দান্ত এক ফিল্ড গোল করে পর্তুগালকে ২-১ ব্যবধানের জয় এনে দেন তিনি। এই জয়সূচক গোলের ওপর ভর করেই পর্তুগাল টুর্নামেন্টের পরবর্তী রাউন্ডে নিজেদের স্থান সুরক্ষিত করে।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন (ফিফা) ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে অফিশিয়াল ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ হিসেবে ঘোষণা করে। এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই ফুটবল বিশ্বে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। ম্যাচ পরবর্তী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ম্যাচে রোনালদোর সামগ্রিক পারফরম্যান্স রেটিং ছিল ৭.০। অন্যদিকে, অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময় মাঠে থেকেও ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণী জয়সূচক গোল করা গনসালো রামোসের রেটিং ছিল ৮.০। এমনকি পর্তুগালের গোলরক্ষক দিয়েগো কস্তা, যিনি পুরো ম্যাচে বেশ কয়েকটি নিশ্চিত গোল প্রতিহত করেছেন, তার রেটিংও ছিল অধিনায়কের চেয়ে বেশি।
ফিফার এই ঘোষণার পর বিশ্বজুড়ে ফুটবল সমর্থকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করছেন। সমর্থকদের একটি বড় অংশের দাবি, পর্তুগালকে টুর্নামেন্টে টিকিয়ে রাখার পেছনে মূল নায়ক ছিলেন গনসালো রামোস এবং পারফরম্যান্সের বিচারে তিনিই এই পুরস্কারের প্রকৃত দাবিদার ছিলেন। অনেকে ফিফার এই সিদ্ধান্তকে পক্ষপাতমূলক ও জনপ্রিয়তাকেন্দ্রীক বলে অভিহিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফুটবল অনুরাগীদের মন্তব্য, মাঠে কার্যকর ভূমিকার চেয়ে রোনালদোর মহাতারকা খ্যাতির কারণেই তাকে এই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে, যা আধুনিক ফুটবলের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের পরিপন্থী।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, নকআউট পর্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এ ধরনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত খেলোয়াড়দের মাঠের পারফরম্যান্সের সঠিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে মাঠের বাইরের এই বিতর্ক ছাপিয়ে পর্তুগাল এখন কোয়ার্টার ফাইনালের রণকৌশল সাজাতে ব্যস্ত, যেখানে তাদের পরবর্তী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মাঠে নামতে হবে।


