ক্রীড়া বিভাগ
ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের রাউন্ড অব ৩২-এর একটি রোমাঞ্চকর ও নাটকীয় ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ ব্যবধানে পরাজিত করে পরবর্তী রাউন্ডে স্থান নিশ্চিত করেছে পর্তুগাল। এই পরাজয়ের ফলে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হলো বর্তমান ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি ক্রোয়েশিয়াকে। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর (VAR) প্রযুক্তির সাহায্যে ক্রোয়েশিয়ার সমতাসূচক গোল বাতিলের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ফুটবল বিশ্বে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ম্যাচ শেষে ক্রোয়েশিয়ার দীর্ঘদিনের কোচ জ্লাতকো দালিচ রেফারিং এবং ভিএআর প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
কানাডার টরোন্টোতে অনুষ্ঠিত এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধে দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলা শুরু করে। ম্যাচের ৫৩ মিনিটে অভিজ্ঞ উইঙ্গার ইভান পেরিসিচের চমৎকার এক গোলে লিড নেয় ক্রোয়েশিয়া। পিছিয়ে পড়ার পর ম্যাচে ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে পর্তুগাল। ফলশ্রুতিতে, ৬৮ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে পর্তুগালকে সমতায় ফেরান তারকা ফরোয়ার্ড ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা সমতায় শেষ হওয়ার পর যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে (৯৪ মিনিট) গনসালো রামোসের দুর্দান্ত গোলে এগিয়ে যায় পর্তুগাল।
ম্যাচের মূল নাটকীয়তা তৈরি হয় একেবারে শেষ মুহূর্তে। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগ মুহূর্তে ক্রোয়েশিয়ার ডিফেন্ডার ইওস্কো গাভার্দিওল পর্তুগালের জালে বল পাঠালে উল্লাসে ফেটে পড়ে ক্রোয়েশিয়ান শিবির। তবে মাঠের রেফারির সিদ্ধান্তের পর ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) দীর্ঘক্ষণ পর্যালোচনা করে অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল ঘোষণা করেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে সমতায় ফেরার সুযোগ হাতছাড়া হয় ক্রোয়েশিয়ার এবং ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে জিতে মাঠ ছাড়ে পর্তুগাল।
ম্যাচ পরবর্তী অফিশিয়াল সংবাদ সম্মেলনে ক্রোয়েশিয়ার কোচ জ্লাতকো দালিচ রেফারিংয়ের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, ম্যাচে রেফারি বেশ কিছু ক্ষেত্রে তাদের প্রাপ্য ফ্রি-কিক থেকে বঞ্চিত করেছেন। তবে পরাজয়ের পেছনে এটিকে একক অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাতে চাননি তিনি। দালিচ মন্তব্য করেন, ম্যাচটি তাদের আরও আগেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া উচিত ছিল।
সংবাদ সম্মেলনে আধুনিক ফুটবলে ভিএআর প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য দেন দালিচ। তিনি অভিযোগ করেন যে, এই প্রযুক্তি ফুটবলের স্বাভাবিক আবেগ এবং আনন্দকে নষ্ট করে দিচ্ছে। প্রযুক্তির চুলচেরা বিশ্লেষণের কারণে মাঠের তাৎক্ষণিক অনুভূতি ও উত্তেজনা ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রেফারিংয়ের এমন পরিস্থিতি এবং সূক্ষ্ম সিদ্ধান্তের সাথে মানিয়ে নেওয়া খেলোয়াড় ও কোচদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যে প্রযুক্তি কখনো কখনো সঠিক সিদ্ধান্তে সহায়তা করে, তবুও এর নেতিবাচক প্রভাব ফুটবলের চিরচেনা রূপকে বদলে দিচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
এই ম্যাচটি ছিল ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে সফল অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি। বিশেষ করে, দলটির ৪০ বছর বয়সী কিংবদন্তি অধিনায়ক ও মিডফিল্ডার লুকা মদরিচের এটিই ছিল শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে রানার্স-আপ এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জনকারী ক্রোয়েশিয়া দলের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন মদরিচ। তাঁর এমন বেদনাদায়ক বিদায়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন কোচ দালিচ। তিনি মদরিচের বিদায়কে ক্রোয়েশীয় ফুটবলের একটি গৌরবময় অধ্যায়ের অবসান হিসেবে অভিহিত করেন।
২০১৭ সাল থেকে ক্রোয়েশিয়ার কোচের দায়িত্বে থাকা জ্লাতকো দালিচ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরবর্তী বিশ্বকাপে তিনি দলের দায়িত্বে থাকবেন কি না, তা দেশে ফিরে ফুটবল বোর্ডের সাথে আলোচনার পর নির্ধারিত হবে বলে জানান। তবে দলের সোনালী প্রজন্মের বিদায় ঘটলেও ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। আজকের ম্যাচে তরুণ খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের প্রশংসা করে তিনি জানান, দলে বেশ কিছু নতুন প্রতিভা উঠে আসছে এবং ক্রোয়েশিয়া দল খুব দ্রুতই একটি নতুন শুরুর মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াবে।


