পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন ডেস্ক
জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাংলাদেশের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং দেশের ডেল্টা বা বদ্বীপ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে ‘ব্লু কার্বন ফাইন্যান্স’ বা সমুদ্র-ভিত্তিক কার্বন অর্থায়ন অত্যন্ত জরুরি বলে উল্লেখ করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়কে ব্লু কার্বন ইকোসিস্টেম বা সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে জলবায়ু, সামাজিক উন্নয়ন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান।
বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অবস্থিত জাতিসংঘ সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সেশনে উদ্বোধনী বক্তব্যে পরিবেশমন্ত্রী এ সব কথা বলেন। ‘এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমন্বিত জলবায়ু কার্যক্রম ত্বরান্বিতকরণ: ব্লু কার্বন অর্থায়নের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা’ শীর্ষক এই বিশেষ সেশনটি যৌথভাবে আয়োজন করে জাতিসংঘ এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন (এসকাপ) এবং ল্যান্ডস্কেপ অ্যালায়েন্স।
পরিবেশমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের জলবায়ু সংকটের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে তিনি জানান, বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। জলবায়ু অভিবাসন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাসের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত বা জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে পারে। এমন উদ্ভূত ও জটিল বাস্তবতায় বাংলাদেশের দীর্ঘ সুন্দরবনসহ অন্যান্য ম্যানগ্রোভ বন এবং উপকূলীয় জলাভূমিগুলো কেবল পরিবেশগত সম্পদ নয়, বরং এগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় জলবায়ু অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা আবশ্যক।
বাংলাদেশ সরকারের চলমান জলবায়ু সহনশীল উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় অত্যন্ত সক্রিয় ও সজাগ রয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাস ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের একটি মেগা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, যা দেশের সবুজ বেষ্টনী নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক জলবায়ু এবং বাস্তুতন্ত্র একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড এবং ইন্দোনেশিয়াসহ এই অঞ্চলের দেশগুলো প্রতিনিয়ত ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি (সী লেভেল রাইজ) এবং উপকূলীয় ক্ষয়ক্ষতির মতো অভিন্ন ও মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এই অভিন্ন সংকটগুলো এককভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণের ওপর জোর দিয়ে পরিবেশমন্ত্রী আরও বলেন, ব্লু কার্বন ম্যাপিং, কার্বন পরিমাপের জন্য একটি অভিন্ন ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি প্রণয়ন এবং এই অঞ্চলে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক কার্বন মার্কেট (কার্বন বাজার) গড়ে তুলতে অংশীদারিত্ব জোরদার করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়াকে বেগবান ও কার্যকর করতে জাতিসংঘ সংস্থা এসকাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আন্তর্জাতিক এই সেশনে এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এর মধ্যে পাকিস্তানের পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী শেজরা মানসাব আলী খান খারাল, মালদ্বীপের পরিবেশমন্ত্রী আলী শরীফ, এসকাপের নির্বাহী সচিব আরমিদা সালসিয়াহ আলিসজাহবানাসহ বিভিন্ন দেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সেশনে বক্তারা আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ব্লু কার্বন অর্থায়নের প্রক্রিয়া সহজীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।


