আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি অন্যতম প্রধান তেল টার্মিনালে রাতভর দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুশ নৌঘাঁটিতেও আঘাত হানা হয়েছে বলে দাবি করেছে কিয়েভ। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলার তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, আক্রান্ত স্থাপনাটি রাশিয়ার যুদ্ধ তহবিলের রাজস্ব জোগানোর অন্যতম প্রধান উৎস ছিল। অন্যদিকে, সেন্ট পিটার্সবার্গের গভর্নর আলেকসান্ডার বেগলভ শহরে ব্যাপক ড্রোন হামলার কথা স্বীকার করলেও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন।
ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত তেল টার্মিনালটি রাশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম জ্বালানি স্থাপনা, যার বার্ষিক ১২.৫ মিলিয়ন টন পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এর পাশাপাশি ক্রনশতাঁতে অবস্থিত রাশিয়ার বাল্টিক নৌবহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটিও এই হামলার শিকার হয়েছে বলে কিয়েভ দাবি করেছে। তবে ক্রনশতাঁতের নৌঘাঁটিতে হামলার বিষয়ে মস্কো এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। গভর্নর বেগলভ জানিয়েছেন, সেন্ট পিটার্সবার্গ এবং লেনিনগ্রাদ অঞ্চলজুড়ে ৭২টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। হামলার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি শহরের পঞ্চাশ লাখের বেশি বাসিন্দাকে ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেন এবং মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যাহত হতে পারে বলে সতর্ক করেন।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানান, সেন্ট পিটার্সবার্গ ও এর আশপাশের যেসব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে, সেগুলো ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় ৮৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। হামলার সুনির্দিষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট না হলেও, প্রকাশিত কিছু ভিডিও চিত্রে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ড্রোন উড়ে যেতে এবং পরবর্তীতে ওই এলাকা থেকে বিশাল কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা জোরদার করেছে। কিয়েভের দাবি, এই ধারাবাহিক হামলার কারণে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ক্ষমতার প্রায় ৪৩ শতাংশ অচল হয়ে পড়েছে, যার ফলে দেশটিতে অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও সম্প্রতি ইউক্রেনীয় হামলার কারণে জ্বালানি সংকটের কথা স্বীকার করেছেন এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে একটি নতুন বিলে স্বাক্ষর করেছেন।
এদিকে, রণক্ষেত্রের পরিস্থিতি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ভিন্ন দাবি পাওয়া গেছে। পূর্ব ইউক্রেনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোস্তিয়ান্তিনিভকা শহরটি রাশিয়ার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী। সামরিক মুখপাত্র মেজর আন্দ্রি কোবালিভ জানিয়েছেন, শহরটি এখনো ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, রুশ পদাতিক বাহিনীর ছোট ছোট দল ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা লাইনের গভীরে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছিল, যাদের চিহ্নিত করে প্রতিহত করা হচ্ছে। এর আগে রুশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে কোস্তিয়ান্তিনিভকা শহরটি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে এসেছে। পুতিনের এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি একে বাস্তবতা বিবর্জিত বলে মন্তব্য করেছেন।
অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের সর্বশেষ সামরিক বুলেটিনে জানিয়েছে যে তারা রাতভর এবং সকালে ইউক্রেনের ছোঁড়া ৫০০টিরও বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। রুশ মন্ত্রণালয়ের দাবি, সম্প্রতি ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার চালানো হামলার ক্ষয়ক্ষতি এবং কোস্তিয়ান্তিনিভকাতে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ব্যর্থতা থেকে আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ সরিয়ে নিতেই কিয়েভ এই ড্রোন হামলার কৌশল নিয়েছে। রাশিয়ার বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় ইউক্রেনের এই হামলাকে উস্কানিমূলক আখ্যা দিয়ে এর কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে মস্কো। এই হামলার ফলে দুই দেশের মধ্যকার চলমান সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত ও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা।


