অপরাধ ও আইন ডেস্ক
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রাজধানীর মিরপুরে শহীদ ইমন হোসেন আকাশ হত্যা মামলায় ৬৩৭ জনের নাম উল্লেখসহ প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছিল। বিগত দুই বছর ধরে তদন্তের পর দেখা গেছে, অভিযুক্তদের মধ্যে ৫৪৯ জনেরই ঘটনার সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। দীর্ঘ তদন্ত শেষে মাত্র ৯১ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, যার মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩২ জন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যায়ের কর্মীদের এই মামলায় আসামি করা হয়েছিল। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, বিপুলসংখ্যক নির্দোষ আসামির সংশ্লিষ্টতাহীনতা প্রমাণ করতেই তাদের দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়েছে, যার ফলে এখনো আদালতে চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হয়নি।
জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সারা দেশে দায়ের হওয়া অধিকাংশ মামলার ক্ষেত্রেই তদন্তকারী কর্মকর্তারা একই ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন। ঘটনার শুরুতেই ঢালাওভাবে আসামি করার কারণে তদন্ত প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল, বর্তমানে তা-ই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাগুলোর মতে, বহু মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে করা হয়েছে। এছাড়া ঘটনাস্থলের সঙ্গে বাস্তবতার অমিল, একই ঘটনায় একাধিক মামলা দায়ের, বাদী কর্তৃক ভিকটিমকে চিনতে না পারা এবং মামলার নামে বাণিজ্যের অভিযোগ তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও গতিহীন করে তুলেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের পর সারা দেশে মোট ১ হাজার ৮৫৫টি মামলা দায়ের করা হয়, যার মধ্যে ৭৯৯টিই হত্যা মামলা। তবে দায়ের হওয়ার দীর্ঘ সময় পরও এখন পর্যন্ত মাত্র ১০৬টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হয়েছে, যার মধ্যে হত্যা মামলা ৩১টি এবং অন্যান্য ধারার মামলা ৭৫টি।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) তদন্তাধীন ২৭২টি মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আদালতে দায়ের হওয়া (সিআর) মামলাগুলোর মধ্যে অপ্রমাণিত হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৬৪ শতাংশ। ১৯৫টি সিআর মামলার মধ্যে ১৪২টি নিষ্পত্তি হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ৯০টি মামলা প্রমাণিত হয়েছে। অপ্রমাণিত মামলার মধ্যে ৬টিতে ভিকটিমের সন্ধান মেলেনি, ১৪টি সরাসরি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে এবং ৩টি মামলায় বাদীর অসহযোগিতা ও সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাব দেখা গেছে। এছাড়া, থানায় দায়ের হওয়ার পরও আদালতে একই ঘটনায় মামলা করার নজির মিলেছে। অন্যদিকে, পিবিআইতে তদন্তাধীন থানার ৭৭টি মামলার মধ্যে মাত্র ৩৭টি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং ৪০টি মামলা এখনো মুলতবি রয়েছে। অর্থাৎ, দুই বছর পেরিয়ে গেলেও অর্ধেকের বেশি মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়নি।
মিরপুরে নিহত ইমন হোসেন আকাশ হত্যা মামলার নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশ জার্মান টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার থেকে ভোকেশনাল এসএসসি পাস করা ইমন ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে আন্দোলন চলাকালে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের সশস্ত্র হামলায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। পল্লবী থানা পুলিশের পর বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে পিবিআইয়ের স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনস শাখা।
তদন্ত কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট এলাকার ভিডিও ফুটেজ, স্থিরচিত্র, কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) এবং ১৮ জন সাক্ষীর জবানবন্দি পর্যালোচনা করেছেন। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, আনিসুল হকসহ শীর্ষ পর্যায়ের বহু নেতাকে আসামি করা হলেও তদন্তে দেখা গেছে, এজাহারনামীয় অনেক আসামির বিরুদ্ধে ঘটনার সপক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। আসামিদের তালিকায় বেশ কয়েকজন বৃদ্ধ, পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং পঙ্গু ব্যক্তির নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। একই সঙ্গে অনেক আসামির নাম-ঠিকানায় ব্যাপক ভুল ত্রুটি মিলেছে। ফলে বিপুলসংখ্যক আসামিকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তদন্ত সংস্থা।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এসব সংবেদনশীল মামলা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশনা দেওয়া হলেও, ঢালাওভাবে নাম অন্তর্ভুক্তির কারণে সৃষ্ট আইনি ও প্রায়োগিক জটিলতায় তদন্তের গতি ব্যাহত হচ্ছে।


