অপরাধ ডেস্ক
নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলায় বহুল আলোচিত পাঁচ বছরের শিশু আসমা আক্তার হত্যা মামলার রায় আজ সোমবার ঘোষণা করা হতে পারে। চার বছর ধরে চলা দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আজ নোয়াখালীর বিশেষ শিশু ট্রাইব্যুনালের বিচারক ফারজানা আক্তারের আদালতে এই মামলার রায় ঘোষণার কথা রয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই রায়কে কেন্দ্র করে নিহত শিশুর পরিবার এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে।
মামলার নথি ও আইনজীবী সূত্রে জানা গেছে, এর আগে বিভিন্ন আইনি ও প্রশাসনিক কারণে মামলার রায় ঘোষণার তারিখ তিন দফা পরিবর্তন করা হয়েছিল। সর্বশেষ আদালত চূড়ান্ত শুনানির পর রায়ের জন্য আজকের দিন অর্থাৎ ৬ জুলাই ধার্য করেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শুক্লা সাহা মামলার সার্বিক প্রস্তুতি এবং রায় ঘোষণার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রায় উপলক্ষে আদালত চত্বর ও এর আশেপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের শিকার আসমা আক্তার চাটখিল উপজেলার বদলকোট ইউনিয়নের মেঘা গ্রামের মৃধা বাড়ির বাসিন্দা মাওলানা মো. শাহজাহানের মেয়ে। অন্যদিকে, এই মামলার একমাত্র অভিযুক্ত আসামি শাহাদাত (২৬) একই গ্রামের বাবুল হোসেনের ছেলে এবং সম্পর্কে নিহত শিশুর চাচাতো ভাই। ঘটনার পর থেকেই আসামি পুলিশ হেফাজতে রয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ভিত্তিতে আদালতে দীর্ঘ বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২২ সালের ২৪ মার্চ দুপুর আনুমানিক দেড়টার দিকে নিজ বাড়ির আঙিনা থেকে নিখোঁজ হয় পাঁচ বছরের শিশু আসমা। পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘ সময় সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি। নিখোঁজের পর চাটখিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয় এবং পুলিশ তদন্ত শুরু করে। ঘটনার নয় দিন পর তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে সন্দিগ্ধ আসামি শাহাদাত চাটখিল থানা পুলিশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ বাড়ির পেছনের একটি পরিত্যক্ত সেপটিক ট্যাংক থেকে নিখোঁজ আসমার গলিত মরদেহ উদ্ধার করে।
মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ শাহাদাতকে সরাসরি এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে তদন্ত চলাকালে আসামি শাহাদাত আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। জবানবন্দিতে সে স্বীকার করে যে, শিশুটিকে ধর্ষণের পর বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সে তাকে নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে এবং অপরাধ গোপন করার উদ্দেশ্যে মরদেহটি সেপটিক ট্যাংকে লুকিয়ে রাখে। পুলিশের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
তৎকালীন সময়ে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে সমগ্র নোয়াখালী জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলার নিষ্পত্তির দাবিতে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন একযোগে আন্দোলনে নামে। জেলার বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল এবং প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা এই অপরাধকে সামাজিক অবক্ষয়ের চরম রূপ হিসেবে আখ্যায়িত করে শুরু থেকেই আসামির সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী ও শিশু নির্যাতনের এই ধরনের মামলায় দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়া এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে তা সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখতে এই রায়ের তাৎপর্য অপরিসীম। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই আইনি লড়াইয়ের পর আজ আদালতের চূড়ান্ত রায়ের দিকে তাকিয়ে আছে নিহতের পরিবার ও সচেতন মহল।


