ক্রীড়া ডেস্ক
চলমান বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর হাইভোল্টেজ ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। নিউ জার্সির স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে শুরুতেই এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও তা হাতছাড়া করা এবং রক্ষণভাগের ব্যর্থতায় ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় লাতিন আমেরিকার এই ফুটবল পরাশক্তি। ম্যাচটিতে প্রথমার্ধের পেনাল্টি মিসই শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দল আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে মেতে ওঠে। খেলার ১২ মিনিটে ডি-বক্সের ভেতর ব্রাজিলীয় ফরোয়ার্ড মাতেউস কুনিয়া ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। স্পট কিকের ঠিক আগমুহূর্তে মাঠের ভেতর স্ট্রাইকার ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও মিডফিল্ডার ব্রুনো গিমারায়েসের মধ্যে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হতে দেখা যায়। পরবর্তীতে ভিনিসিয়ুস সরে দাঁড়ালে শট নেওয়ার দায়িত্ব নেন গিমারায়েস। তবে ধীরে ধীরে রান-আপ নিয়ে নরওয়ের অভিজ্ঞ গোলকিপার অরিয়ান হাস্কিয়োল্ড নাইল্যান্ডকে পরাস্ত করার চেষ্টা করলেও সফল হননি এই ব্রাজিলীয় মিডফিল্ডার। নাইল্যান্ড বাম দিকে ঝাঁপিয়ে দুর্দান্তভাবে বলটি রুখে দিয়ে নরওয়েকে প্রাথমিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেন।
শুরুর এই ধাক্কা সামলে উঠে নরওয়ে ক্রমান্বয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়। কাউন্টার অ্যাটাক ও সুশৃঙ্খল রক্ষণভাগকে পুঁজি করে তারা ব্রাজিলের আক্রমণভাগকে বোকা বানাতে সক্ষম হয়। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ে ২-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটে নেয় নরওয়েজিয়ানরা। অন্যদিকে, নকআউট পর্বের প্রথম ম্যাচেই এমন পরাজয়ে কোটি ভক্তকে হতাশ করে মাঠ ছাড়তে হয় ব্রাজিল দলকে।
ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে স্বাভাবিকভাবেই ব্রাজিলের পেনাল্টি নেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো ফরোয়ার্ড থাকতে ব্রুনো গিমারায়েসকে দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় সেলেসাও কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে। দলটির প্রধান কোচ জানান, এই সিদ্ধান্তটি আবেগতাড়িত ছিল না, বরং সম্পূর্ণ পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছিল।
আনচেলত্তি বলেন, “ম্যাচের আগে আমরা বিগত এক বছরে আমাদের খেলোয়াড়দের এবং প্রতিপক্ষ দলের পারফরম্যান্সের পরিসংখ্যান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেছি। আমাদের তথ্য অনুযায়ী, দলের সেরা পেনাল্টি টেকারদের তালিকায় ক্রমান্বয়ে রয়েছেন নেইমার, ইগো থিয়াগো ও রাফিনিয়া। তাদের ঠিক পরেই অবস্থান ব্রুনো গিমারায়েসের এবং পঞ্চম স্থানে রয়েছেন গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি।”
কোচ আরও স্পষ্ট করেন যে, ম্যাচের ১২ মিনিটে যখন পেনাল্টি অর্জিত হয়, তখন নেইমার, থিয়াগো কিংবা রাফিনিয়ার কেউ-ই মাঠে উপস্থিত ছিলেন না। ফলে গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী মাঠে থাকা খেলোয়াড়দের মধ্যে গিমারায়েসকেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মনে করেছে দলীয় ম্যানেজমেন্ট।
পরিসংখ্যান ঘাটলে দেখা যায়, গত ঘরোয়া মৌসুমে নিউক্যাসেল ইউনাইটেডের হয়ে ব্রুনো গিমারায়েস দুটি পেনাল্টি শটের দুটিতেই গোল করতে সক্ষম হয়েছিলেন, যদিও তিনি ক্লাবের নিয়মিত পেনাল্টি শ্যুটার ছিলেন না। অন্যদিকে, রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে ২০২৫-২৬ মৌসুমে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র সাতটি পেনাল্টির মধ্যে পাঁচটিতে গোল করেন এবং দুটি মিস করেন। তবে জাতীয় দলের হয়ে ২০২৩ সালে পাওয়া একমাত্র পেনাল্টি সুযোগটি তিনি সফলভাবে গোলে রূপান্তর করেছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ভিনিসিয়ুসের সাম্প্রতিক পেনাল্টি মিসের খতিয়ান এবং গিমারায়েসের শতভাগ সফলতার রেকর্ডের কারণেই টিম ম্যানেজমেন্ট এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে বড় মঞ্চের স্নায়ুচাপ ধরে রাখতে না পারায় খেসারত দিতে হলো পুরো দলকে। শুরুতে লিড নিতে পারলে ম্যাচের কৌশল ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান ব্রাজিলের অনুকূলে থাকত, যা তাদের কোয়ার্টার ফাইনালের পথে এগিয়ে দিতে পারত। এই হারের ফলে বিশ্বমঞ্চে ব্রাজিলের আরও একটি হেক্সা (ষষ্ঠ শিরোপা) জয়ের মিশন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো।


