অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
বিগত এক বছরে বিশ্বজুড়ে বিলিয়নেয়ার বা শতকোটিপতিদের সংখ্যা ও সম্পদের পরিমাণ উভয় ক্ষেত্রেই রেকর্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে পুঁজিবাজারে সৃষ্ট গতিশীলতা এবং বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অতিধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউবিএসের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
ইউবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে বিশ্বব্যাপী বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩ হাজার ৩০২ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে এই অতিধনীদের গড় সম্পদের পরিমাণ ২৫ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে, বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষের গড় ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির গতির তুলনায় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কম। গবেষণা থেকে জানা যায়, বর্তমানে বিশ্বের ১৯ জন ব্যক্তির সম্পদের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং ১৮ জন ব্যক্তির সম্পদ ৫০ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। এই অতিধনীদের সিংহভাগই যুক্তরাষ্ট্রের অধিবাসী।
ইউবিএসের অর্থনীতিবিদদের মতে, অধিকাংশ বিলিয়নেয়ারের সম্পদ মূলত তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে পুঁজিবাজারের ঊর্ধ্বগতির সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব তাদের সম্পদে পড়েছে। বিশেষ করে এআই-সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারের অভূতপূর্ব মূল্যবৃদ্ধি এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। পুঁজিবাজারে যে দেশগুলোর অংশগ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণ বেশি, সেসব দেশের ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির হারও বেশি দেখা গেছে।
সম্পদ ও আবাসন বিষয়ক বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাইট ফ্রাঙ্কের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই প্রবৃদ্ধির ধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। ২০৩১ সাল নাগাদ বিশ্বে বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা প্রায় চার হাজারে পৌঁছাতে পারে, যার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৯১৫ জন। শুধু শতকোটিপতি নয়, বিশ্বজুড়ে মাল্টিমিলিয়নেয়ারদের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। যাদের নিট সম্পদের পরিমাণ কমপক্ষে ৩ কোটি ডলার, ২০২১ সালে এমন মানুষের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৬২ হাজার ১৯১ জন, যা বর্তমানে ৩০০ শতাংশের বেশি বেড়ে ৭ লাখ ১৩ হাজার ৬২৬ জনে পৌঁছেছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও বৈশ্বিক যোগাযোগের সুবিধার কারণে এখন একটি ব্যবসাকে দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়ে বিপুল সম্পদ অর্জন করা সহজ হয়ে পড়েছে বলে গবেষকরা মনে করেন।
একই গতিতে বেড়েছে মিলিয়নেয়ার বা কোটিপতিদের সংখ্যাও। ইউবিএসের তথ্যানুযায়ী, গত বছর বিশ্বে মিলিয়নেয়ারের সংখ্যা ৫ কোটি ৭৫ লাখ ছাড়িয়েছে। পুঁজিবাজারের ঊর্ধ্বগতি ও মার্কিন ডলারের মানের সাময়িক ওঠানামা এই প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। নতুন মিলিয়নেয়ার তৈরির ক্ষেত্রে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে গত বছর ৪ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ নতুন করে এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। এছাড়া যুক্তরাজ্যেও একই সময়ে ৪৩ হাজারের বেশি নতুন মিলিয়নেয়ার তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বে একক ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি সম্পদের মালিক মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক, যার সম্পদ সম্প্রতি সাময়িকভাবে ১ ট্রিলিয়ন ডলারও স্পর্শ করেছিল। সম্পদের দিক থেকে এর পরেই রয়েছেন গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন। তবে বৈশ্বিক এই ঊর্ধ্বগতির মধ্যেও যুক্তরাজ্যে বিলিয়নেয়ারের সংখ্যায় কিছুটা পতন দেখা গেছে, যা দেশটির গত তিন দশকের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হ্রাস।
এই বিপুল সম্পদ বৃদ্ধির সমান্তরালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও প্রকট আকার ধারণ করছে। ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র দশমিক শূন্য শূন্য ১ শতাংশ অতিধনী মানুষ বৈশ্বিক জনসংখ্যার অর্ধেক জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত সম্পদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি সম্পদের মালিক।
অর্থনীতিবিদ এবং শ্রম অধিকারকর্মীরা সতর্ক করে বলছেন, সম্পদ ও ক্ষমতার এই তীব্র কেন্দ্রীকরণ সমাজে সামাজিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। একদিকে অতিধনীদের সম্পদ ও রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ কর্মীদের আয় ও জীবনযাত্রার মান সেই অনুপাতে বাড়ছে না। উন্নত দেশগুলোতেও সাধারণ মানুষকে ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে টিকে থাকতে তীব্র সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে।


