মধ্যপ্রাচ্যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি অবসান: ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও বিশ্ব অর্থনীতিতে সংকটের আশঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি অবসান: ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও বিশ্ব অর্থনীতিতে সংকটের আশঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর ঘোষিত ছয় দিনের শোক পালন শেষ হতেই মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছে। এর ফলে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল আবারও এক গভীর সামরিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন এক সাক্ষাৎকারে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জানান, এই যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী না হওয়ার মূল কারণ ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বহুমাত্রিক বিভাজন। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উপর্যুপরি হামলায় ইরানের শীর্ষ সারির একাধিক নেতার মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে দেশটিতে একটি বড় ধরনের নেতৃত্ব ও ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছে এবং ক্ষমতা কাঠামোর বিভিন্ন অংশের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করেছে।

বর্তমানে ইরানের নীতি নির্ধারণী মহলে দুটি ভিন্ন ধারার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে দেশটির প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বেসামরিক প্রশাসন কূটনৈতিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সংকটের সমাধান খুঁজছেন। অন্যদিকে, দেশটির প্রভাবশালী সামরিক শাখা ‘ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী’ (আইআরজিসি) কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণসহ সামগ্রিক সামরিক শক্তির চাবিকাঠি নিজেদের হাতে রেখেছে। এই দুই পক্ষের ভিন্নমুখী অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে কোনো একক পক্ষের চুক্তি বা সমঝোতা বাস্তবায়ন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রধান অন্তরায়।

বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কট্টরপন্থী সামরিক অংশের এই নিয়ন্ত্রণ বিশ্ববাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণও এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। মার্কিন প্রশাসনের দূরদর্শী কৌশলের অভাব এবং ২০২৬ সালের আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টা মার্কিন নীতিকে প্রভাবিত করছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন প্রশাসন এই মুহূর্তে যেকোনো ধরনের বড় সামরিক সংঘাত এড়াতে চাইছে, যা ইরানের কট্টরপন্থী অংশটিকে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করার সুযোগ করে দিচ্ছে।

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিও বর্তমানে বেশ নাজুক। দেশটিতে তীব্র পানি সংকট ও চরম অর্থনৈতিক মন্দা বিরাজ করছে, যা জনগণের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং হরমুজ প্রণালির সামরিক উত্তেজনা পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিধ্বংসী যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ