টানা ৯ দিনের ভারি বর্ষণে কক্সবাজারে ৮৯০ কোটি টাকার ক্ষতি, নিহত ৩২

টানা ৯ দিনের ভারি বর্ষণে কক্সবাজারে ৮৯০ কোটি টাকার ক্ষতি, নিহত ৩২

জাতীয় ডেস্ক

কক্সবাজারে টানা ৯ দিনের রেকর্ড বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড়ধসে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে এসেছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ প্রতিবেদনে জেলার সড়ক যোগাযোগ, বেড়িবাঁধ, বসতবাড়ি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভূতপূর্ব ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ১৪ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ৩২ জনের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করেছে জেলা প্রশাসন। এছাড়া নিখোঁজ রয়েছেন আরও একজন।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের তথ্যানুযায়ী, গত ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত জেলায় মোট ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের মুখে জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭০টি এবং ৫টি পৌরসভার মধ্যে ৪টি প্লাবিত হয়। ফলে জেলার প্রায় ৪৯ শতাংশ এলাকা সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে যায় এবং অন্তত আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। বন্যা ও পাহাড়ধসে সামগ্রিকভাবে জেলার ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি পরিবার এবং ২৪ লাখের বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছেন।

উপজেলাওয়ারী প্লাবনের চিত্রে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পেকুয়া উপজেলা। এখানকার ৯৫ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এছাড়া মাতামুহুরীতে ৮৫ শতাংশ, চকরিয়ায় ৮০ শতাংশ, কুতুবদিয়ায় ৬৫ শতাংশ এবং মহেশখালীতে ৫০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। তুলনামূলক কম প্লাবিত এলাকার মধ্যে রয়েছে রামু (৩৫ শতাংশ), কক্সবাজার সদর (২৫ শতাংশ), উখিয়া (২৫ শতাংশ), টেকনাফ (২৫ শতাংশ) এবং ঈদগাঁও (৫ শতাংশ)।

এই দুর্যোগে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে মানুষের জীবনের ওপর। পাহাড়ধস ও বন্যাজনিত দুর্ঘটনায় মোট ৩২ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে উখিয়া উপজেলাতেই পাহাড়ধসে ১৪ জন রোহিঙ্গা নাগরিকসহ মোট ১৪ জনের মৃত্যু হয়। জেলা প্রশাসনের সমন্বিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত জেলার আর্থিক ক্ষতির প্রাথমিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৯০ কোটি টাকা। তবে মাঠপর্যায়ে চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই শেষে এই ক্ষতির অঙ্ক আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

দুর্যোগে জেলার ১ হাজার ৬১৩টি বসতবাড়ি সম্পূর্ণ বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে পেকুয়ায় সর্বোচ্চ ৪৫০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যান্য উপজেলার মধ্যে চকরিয়ায় ৩০০টি, কুতুবদিয়ায় ২৫০টি, মহেশখালীতে ২০০টি, মাতামুহুরীতে ১৯০টি, টেকনাফে ১০০টি, উখিয়ায় ৫০টি, ঈদগাঁওয়ে ৩০টি, রামুতে ২৫টি এবং কক্সবাজার সদরে ১৮টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও ভয়াবহ। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জেলার মোট ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সড়ক ও সেতুর ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায়। চকরিয়ায় ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি সেতু-কালভার্ট, মাতামুহুরীতে ১৯০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি সেতু-কালভার্ট এবং পেকুয়ায় ২৩০ কিলোমিটার সড়ক ও দুটি সেতু-কালভার্ট ভেঙে গেছে। অন্যান্য উপজেলার মধ্যে রামুতে ৫০ কিলোমিটার, কক্সবাজার সদরে ২০ কিলোমিটার, কুতুবদিয়ায় ৯ কিলোমিটার, উখিয়ায় ৬ কিলোমিটার এবং টেকনাফ ও ঈদগাঁওয়ে ৫ কিলোমিটার করে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেতু ও কালভার্টের ক্ষেত্রে টেকনাফে ১৫টি, উখিয়ায় ১২টি, রামুতে ৫টি, কক্সবাজার সদরে ৪টি এবং পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় দুটি করে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পানির তোড়ে নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধগুলোও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধীনস্থ ৩৮০ দশমিক ২৯৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় ৪৪টি স্থান ভেঙে গেছে। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানান, মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পূর্বপাড়া এলাকায় প্রায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ ও একটি সেতুর অংশ ধসে গেছে। বৃষ্টি কমলে ও বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত এসব বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু হবে।

শিক্ষা খাতের ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তালিকায় পেকুয়া ও কুতুবদিয়া উপজেলায় ১৫টি করে মোট ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য মিলেছে। অন্য উপজেলাগুলোর তালিকা প্রস্তুতের কাজ এখনও প্রক্রিয়াধীন।

বিপর্যস্ত মানুষের সহায়তায় জেলা প্রশাসন জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, জেলার ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ইতোমধ্যে ১ হাজার ৫৮০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গত এলাকার মানুষদের সহায়তায় এ পর্যন্ত ৭ হাজার ৭৯০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ২৯৮ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ও স্থানীয় সেচ্ছাসেবীরা কাজ করে যাচ্ছেন।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ