বাংলাদেশকে প্রতিবন্ধীবান্ধব রোল মডেল করতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের তাগিদ স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর

বাংলাদেশকে প্রতিবন্ধীবান্ধব রোল মডেল করতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের তাগিদ স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর

জাতীয় ডেস্ক

সব মন্ত্রণালয় একযোগে কাজ করলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে ‘ডিস্যাবিলিটি ইনক্লুসিভ সোসাইটি’ বা প্রতিবন্ধীবান্ধব সমাজের অনন্য রোল মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কোনো চ্যারিটি বা দয়া নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ অধিকারভিত্তিক সমাজ গঠনে কাজ শুরু করেছে সরকার।

সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ‘শিশুস্বর্গ মডেল’ বাস্তবায়ন শীর্ষক পাইলট প্রজেক্ট প্রণয়নে অংশীজনদের এক পরামর্শ সভায় প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সভায় টেকসই পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের প্রতিটি জেলায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় ‘শিশুস্বর্গ’ নামক বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ও স্পেস গড়ে তোলার সক্ষমতা রয়েছে। এই কেন্দ্রগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশাল মাঠকর্মী বাহিনী তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করবে। প্রাথমিক মেডিকেল অ্যাটেনশন ও থেরাপির মাধ্যমে এই ‘শিশুস্বর্গ’ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ তৈরি করা হবে, যা চিকিৎসার সাথে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের একটি নিখুঁত সমন্বয় ঘটাবে।

সরকার প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় রাষ্ট্রীয় সেবা ও অধিকার পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি মেগা টার্গেট বা বৃহৎ লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ড. মুহিত জানান, দেশে বর্তমানে ৪৬ লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সরকারি ডেটাবেজের আওতায় থাকলেও প্রকৃত সংখ্যা অন্তত ১ কোটি। বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী স্টিয়ারিং কমিটি গঠিত হয়েছে।

আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের ঘাটতি দূর করতে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আগ্রহে দুটি বিশেষ কমিটি গঠনের কথা উল্লেখ করে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দয়া করছে—এমন পরিবেশ সরকার চায় না। অন্য সব নাগরিকের মতো সমঅধিকার যেন তারা উপভোগ করতে পারেন, সেটাই মূল লক্ষ্য।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ‘প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও সেবা সুরক্ষা নীতি নির্ধারণ স্টিয়ারিং কমিটি’ গঠিত হয়েছে, যেখানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বিকল্প সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া নীতিসমূহ মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য গঠিত ‘প্রতিবন্ধী অধিকার ও সেবা সুরক্ষা বাস্তবায়ন কমিটি’র সভাপতি করা হয়েছে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীকে এবং সহ-সভাপতি হিসেবে রয়েছেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী। কমিটিগুলো গঠনের মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে প্রথম এবং এক মাসের মধ্যে দ্বিতীয় সভা সম্পন্ন করার মাধ্যমে কাজের গতিশীলতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

শীর্ষ পর্যায়ের এই সমন্বয়ের ফলে ইতোমধেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজ শুরু করেছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মেট্রোরেলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অর্ধেক ভাড়া বা বিনামূল্যে যাতায়াতের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একইভাবে প্রতিটি মন্ত্রণালয় তাদের নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনাকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করার উদ্যোগ নিচ্ছে।

সেবাপ্রদান প্রক্রিয়াটিকে গতিশীল ও সুনির্দিষ্ট করতে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী একে একটি ‘কনভেয়র বেল্ট’ এর সাথে তুলনা করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, একজন প্রতিবন্ধী শিশু যখন জন্মায়, তখন তার এক ধরনের চিকিৎসা ও থেরাপির প্রয়োজন হয়। ৬ বছর বয়সে তার চাহিদা ভিন্ন হয়, ১২ বছর বয়সে প্রতিবন্ধী কিশোরীর প্রয়োজন আলাদা এবং যৌবনে পদার্পণ করলে তার দরকার হয় কর্মসংস্থান। জন্ম থেকে কর্মসংস্থান পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ধাপে রাষ্ট্র তার পাশে থাকবে এবং কনভেয়ার বেল্টের মতো ধাপে ধাপে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সমন্বয় করে তার চাহিদা পূরণ করবে। এই দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের ওপরই দেশের সামাজিক উন্নয়ন নির্ভর করছে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ