বিভাগ: দুর্যোগ ও উন্নয়ন ডেস্ক
চট্টগ্রাম নগরের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে পাহাড়, নদী ও সমুদ্রবেষ্টিত এই বাণিজ্যিক রাজধানীর খালগুলো পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বুধবার (১৫ জুলাই) সকালে চট্টগ্রাম মহানগরীর হালিশহর এলাকায় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে অংশ নিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, বন্দর নগরীর ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও গুরুত্ব বিবেচনা করে নগরবাসীকে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে বন্যার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে সরকার কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম ভৌগোলিকভাবে পাহাড়, নদী ও সাগরের সমন্বয়ে গঠিত। তবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং খালগুলো দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরের বড় একটি অংশ তলিয়ে যায়। মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, নগরীর প্রধান খালগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনাই বর্তমান পরিস্থিতির প্রধান সমাধান। খাল পুনঃখনন করা হলে পানি দ্রুত নিষ্কাশন সম্ভব হবে, যা জলাবদ্ধতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এ লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করেছে।
সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, সরকার কেবল তাৎক্ষণিক ত্রাণ বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা এখন মূল অগ্রাধিকার। বন্যায় ঘরবাড়ি ও জীবিকার যে ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে পুনর্বাসন সহায়তা প্রদান করা হবে। ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা সঠিকভাবে প্রণয়ন করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন যাতে কোনো প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সহায়তার বাইরে না থাকে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহদাত হোসেন বলেন, নগরীর জলাবদ্ধতা সমস্যা কেবল একটি একক দপ্তরের নয়, বরং এটি একটি সামগ্রিক সংকটে রূপ নিয়েছে। খাল পুনঃখনন ও অবৈধ দখল উচ্ছেদ করার মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য সরকারি সংস্থার সাথে একত্রে কাজ করছে। জলাবদ্ধতা নিরসন না হওয়া পর্যন্ত এই কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান তার বক্তব্যে পাহাড় রক্ষা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিক করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, খালগুলো শুধু পুনঃখনন করলেই হবে না, বরং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থায় প্রচুর পরিমাণে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য জমে থাকার কারণে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ ও খালগুলো বর্জ্যমুক্ত রাখতে নগরবাসীর সচেতনতার বিকল্প নেই।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া বলেন, দুর্যোগ পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন করা হচ্ছে। তিনি জানান, প্রশাসন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা চূড়ান্ত করছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের হাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান ও বর্ষা মৌসুমের দীর্ঘস্থায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কেবল খাল খননই যথেষ্ট নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদী টেকসই অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। সরকার যে খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে নগরীর নিষ্কাশন সক্ষমতা বাড়বে। তবে প্রকল্পের সফলতার জন্য এর নিয়মিত তদারকি এবং খালগুলোর উভয় পাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে টেকসই বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে বর্ষা পরবর্তী শুষ্ক মৌসুমে খাল পুনঃখননের বড় অংশ সম্পন্ন করা যায়। সরকারের এই সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে চট্টগ্রাম নগরের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা অনেকাংশে লাঘব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


