অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
ইরানের সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে টানা চতুর্থ দিনের মতো অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৮৫ দশমিক ২৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ দশমিক ০২ ডলারে পৌঁছেছে। টানা চার দিন দাম বাড়ার ফলে উভয় সূচকই মঙ্গলবার স্পর্শ করা এক মাসের সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
বুধবার ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ আরোপ এবং দেশটির উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে হামলার পর এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান আঞ্চলিক জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। দেশটি জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক ধরনের ‘অস্তিত্বের যুদ্ধে’ লিপ্ত রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের শৃঙ্খলাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
জ্বালানি বাজারের মূল উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরুর পর জুনে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সংঘাতের বিস্তার ঘটলে ইরান ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমনটি ঘটলে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দুটি জ্বালানি পরিবহন পথ একই সঙ্গে হুমকির মুখে পড়বে, যা জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি করবে।
নিসান সিকিউরিটিজ ইনভেস্টমেন্টের বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যদিও প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যস্থতায় সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের সম্ভাবনা এখনো সীমিত বলে মনে করা হচ্ছে, তবুও উত্তেজনার প্রভাবে বাজারে তেল কেনার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সংঘাতের তীব্রতা বাড়লে ডব্লিউটিআই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৫ থেকে ৮৭ ডলারের সীমায় পৌঁছাতে পারে।
গোল্ডম্যান স্যাক্সের প্রাক্কলন অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানি স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগলে চলতি বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার অতিক্রম করতে পারে। তবে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত হলে এবং জ্বালানি উৎপাদন প্রত্যাশিত গতিতে বাড়লে বছরের শেষভাগে দাম ৬০ ডলারের ঘরে নেমে আসার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, ১০ জুলাই শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশটিতে অপরিশোধিত তেলের মজুত ১৭ লাখ ব্যারেল হ্রাস পেয়েছে। যদিও বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য বিবেচনায় বিশ্লেষকরা আরও বড় ঘাটতির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। মজুত হ্রাসের এই প্রবণতা বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে চলমান উদ্বেগকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর।


