হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন হামলা ও ইরানের তীব্র প্রতিক্রিয়া: মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে

হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন হামলা ও ইরানের তীব্র প্রতিক্রিয়া: মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্য করে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা তৈরির প্রতিক্রিয়ায় এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নতুন করে কঠোর অবরোধ আরোপ করেছে ওয়াশিংটন।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বুধবার দিনের দ্বিতীয় দফার হামলায় গ্রেটার টুনব দ্বীপে অবস্থিত ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মজুত এবং উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে ৯০ মিনিট ধরে টানা আক্রমণ চালানো হয়। সেন্টকমের দাবি, এই অভিযানের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর মতো ইরানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইরানের বন্দরগুলোতে ফের অবরোধ আরোপ করার পর থেকে অন্তত দুটি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হয় বলে সামরিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এই সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের ‘ভদ্র আচরণ’ করা প্রয়োজন। যদিও কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা (ডেডলাইন) ঘোষণা করেননি, তবে ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে যুদ্ধের হুমকি হিসেবেই দেখছে বিশ্লেষকরা। গত এপ্রিলে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছিল। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ফলকার টার্ক সে সময় সতর্ক করে বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক অবকাঠামোয় যেকোনো ধরনের হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

অন্যদিকে, মার্কিন এই পদক্ষেপের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। দেশটির প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও হরমুজ প্রণালিতে আধিপত্য বজায় রাখা দেশটির অস্তিত্বের প্রশ্ন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্তিত্ব রক্ষার এই লড়াইয়ে আলোচনার চেয়ে প্রতিরোধ কৌশলই এখন তেহরানের মূল লক্ষ্য। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, মার্কিন অবরোধের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস রপ্তানির রুটগুলো বন্ধ করে দিতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহন পথ। বর্তমান বৈরিতার কারণে এই রুটে ট্যাংকার চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত মাসে উভয় দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে যুদ্ধের অবসানের যে চেষ্টা করা হয়েছিল, নতুন এই সংঘাত ও অবরোধের ফলে তা পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে এই দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ এখন কেবল দুই দেশের সামরিক সংঘাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ইরানের হামলার দাবির পর ওয়াশিংটন যে পাল্টা সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের নীতি গ্রহণ করেছে, তাতে চলমান পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করছে। কূটনৈতিক আলোচনার পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় এই অঞ্চল এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ