তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিকম ডেস্ক
গত এক দশকে বাংলাদেশে মোবাইল গ্রাহক, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং ডাটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। তবে এই দৃশ্যমান পরিকাঠামোগত সাফল্যের পরেও দেশ এখনো মূলত একটি ‘প্রযুক্তি ব্যবহারের বাজার’ বা ডিজিটাল কনজাম্পশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় নিজস্ব উচ্চ-মূল্যের তথ্যপ্রযুক্তি তৈরি, বৈশ্বিক সেবা রপ্তানি এবং মৌলিক প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে বাংলাদেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে বেশ পিছিয়ে রয়েছে।
শনিবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত ‘টেলিকম খাতের ভবিষ্যৎ: নতুন সরকার কী ভাবছে’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় দেশের টেলিকম খাতের এই সামগ্রিক চিত্র ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের বিষয়টি উঠে আসে। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা দেশের প্রযুক্তি খাতের রূপান্তরের ওপর জোর দেন।
উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের তুলনায় দেশের মোবাইল গ্রাহক সংখ্যা ৩৯ শতাংশ বেড়ে ১৮ কোটি ৬০ লাখে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩৭ শতাংশ বৃদ্ধির মাধ্যমে মোট জনসংখ্যার ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এই সময়ে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহার ৮৬ জিবিপিএস থেকে ১২৭ গুণ বেড়ে প্রায় ১০ হাজার ৯৫৪ জিবিপিএসে দাঁড়িয়েছে এবং গ্রাহক প্রতি মোবাইল ডাটা ব্যবহারের পরিমাণ ১০০ এমবি থেকে ৮০ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৮ জিবিতে উন্নীত হয়েছে।
সংযোগ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই বড় সাফল্য সত্ত্বেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারের মতো উচ্চ-মূল্যের প্রযুক্তি উদ্ভাবন বা সেবা রপ্তানি হাব হিসেবে পুরোপুরি আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে টেলিকম খাতের অবদান বর্তমানের ৮ শতাংশ থেকে আরও বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব, যদি সঠিক নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।
প্রতিবেদনে দেশের ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা ও ভবিষ্যতের চাহিদার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়। চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা ছিল ১৪ হাজার ৮৩৩ জিবিপিএস, যার ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ ইতোমধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ৫জি প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের কারণে ২০৩৫ সালের মধ্যে এই চাহিদা ১২০ টিবিপিএস (টেরাবিটস পার সেকেন্ড) ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই বিশাল চাহিদা পূরণে সাবমেরিন কেবল সি-মি-উই-৬ এবং বেসরকারি কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও ফাইবারের বিস্তৃতি এবং ডেটা সেন্টারের আধুনিকায়নে একটি সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন। বর্তমানে জাতিসংঘের ‘টেলিকমিউনিকেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনডেক্স ২০২৪’ অনুযায়ী ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩তম, যা দেশের পরিকাঠামো উন্নয়নের বড় প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে।
আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ৫ জিবি ডাটার খরচ মাথাপিছু জাতীয় আয়ের মাত্র ০ দশমিক ৮৩ শতাংশ, যা বৈশ্বিক সাশ্রয়িতার সূচকে মোবাইল ব্রডব্যান্ডে বাংলাদেশকে ৬ষ্ঠ এবং ফিক্সড ব্রডব্যান্ডে ৩য় স্থানে রেখেছে। বাংলাদেশে প্রতি গিগাবাইট (জিবি) ডাটার গড় দাম মাত্র ৭ সেন্ট (প্রায় ৯ টাকা), যা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের (১২ সেন্ট বা ১৪.৭ টাকা) চেয়েও কম। তবে এই সাশ্রয়ী মূল্যের বিপরীতে ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের মান এবং স্মার্টফোনের পেনিট্রেশন (যা বর্তমানে প্রায় ৫৬ শতাংশ) বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় ধরনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একই সাথে দেশের ইন্টারনেটের ট্রাফিক জেনারেশনে বৈশ্বিক ডিজিটাল জায়ান্টদের একচ্ছত্র আধিপত্য দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের মোট মোবাইল ও ফিক্সড ইন্টারনেট ট্রাফিকের একটি বড় অংশই মেটা ও আমাজনের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো দখল করে রাখছে।
আলোচকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় নীতি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমেই কেবল টেলিকম খাতকে বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এর জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা এবং দেশীয় উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার মতো উপযুক্ত পরিবেশ।
টিআরএনবির সভাপতি সমীর কুমার দে’র সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবিন। গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্য প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। বক্তারা দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের টেকসই উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।


