জাতীয় ডেস্ক
সারাদেশে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং জনবল ৩০ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার। একই সাথে বাহিনীর সদস্যদের আবাসন সংকট দূরীকরণ এবং বিশেষ ভাতা চালুর বিষয়টিও সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। মঙ্গলবার (১৯ মে) ‘ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহ-২০২৬’, পাসিং আউট প্যারেড ও পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এসব তথ্য জানান।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা, বন্যা, ভবনধস ও ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে ফায়ার সার্ভিসের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। যেকোনো দুর্যোগে এই বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে জানমাল রক্ষায় কাজ করেন, যা দেশের মানুষের কাছে তাদের একটি বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। এই সেবার মান আরও বেগবান করতে সরকার সারাদেশে নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণ, অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহ, ডুবুরি ইউনিট সম্প্রসারণ এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা গড়ে তোলার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, বর্তমানে দেশে ৫৩৮টি ফায়ার স্টেশনের মাধ্যমে সেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় এই সংখ্যা পর্যাপ্ত না হওয়ায় আরও ২০টি ফায়ার স্টেশন নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ প্রকল্প চলমান রয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসা ও জরুরি উদ্ধারসেবা দ্রুততর করতে ১০০টি নতুন অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। উদ্ধারকাজে বিশেষায়িত ডুবুরিদের সক্ষমতা বাড়াতে সম্প্রতি ৭২টি নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। একই সাথে, সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়াতে ফায়ার সার্ভিসের অর্গানোগ্রাম পুনর্গঠন করে মোট সদস্য সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বিবেচনাধীন রয়েছে।
নাগরিক সেবা সহজীকরণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত ১ মে থেকে অনলাইনভিত্তিক ‘ই-ফায়ার লাইসেন্স’ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন। এর মাধ্যমে এখন থেকে ব্যবসায়িক ও প্রাতিষ্ঠানিক ফায়ার লাইসেন্স প্রাপ্তি আরও দ্রুত ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত সুযোগ-সুবিধা এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, সদস্যদের দীর্ঘদিনের আবাসন সমস্যা সমাধানে ঢাকার মিরপুর ও সদরঘাট এলাকায় বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। এছাড়া মিরপুরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত নতুন সদর দপ্তর ভবন নির্মাণের কাজও প্রক্রিয়াধীন। বাহিনীর সদস্যদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কাজের অনুপ্রেরণা বাড়াতে বিশেষ ‘ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ ভাতা’ এবং ‘ফ্রেশ মানি’ দেওয়ার বিষয়টি বর্তমানে সরকারের উচ্চপর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বক্তব্যের একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিভিন্ন সময় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন উৎসর্গকারী ফায়ার সার্ভিসের ৫২ জন বীর সদস্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।
বিগত বছরের আভিযানিক সফলতার পরিসংখ্যান তুলে ধরে অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ২০২৫ সালে ফায়ার সার্ভিস সারাদেশে মোট ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করেছে, যার মাধ্যমে আনুমানিক ৩ হাজার ২৬৩ কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। একই সময়ে ৭ হাজার ৮১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে ৯ হাজার ২৬৬ জন আহত এবং ১ হাজার ৩৮ জন নিহতের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রায় ১৫ হাজার গণসংযোগ, ১০ হাজারের বেশি ভবন পরিদর্শন এবং আড়াই লাখের বেশি নাগরিককে অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ক মৌলিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এবং নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু।
অনুষ্ঠানের শেষভাগে স্টেশন অফিসার, ফায়ার ফাইটার, ড্রাইভার ও ডুবুরিসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির মোট ২৩৪ জন সদস্যের অংশগ্রহণে একটি আকর্ষণীয় পাসিং আউট প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বহুমাত্রিক বীরত্বপূর্ণ ও সাহসিকতাপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৩ সালের ৩৪ জন এবং ২০২৪ সালের ৫০ জনসহ ফায়ার সার্ভিসের মোট ৮৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর হাতে মর্যাদাপূর্ণ পদক তুলে দেন।


