অর্থ বাণিজ্য ও অপরাধ ডেস্ক
ঐতিহ্যগত তাসের আড্ডা কিংবা গোপন আসর পেরিয়ে জুয়ার আধুনিক রূপ এখন মোবাইল ফোনের পর্দায়। প্রযুক্তির অপব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপন এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসকে (এমএফএস) পুঁজি করে সারা দেশে গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর অনলাইন বেটিং সিন্ডিকেট। এই ডিজিটাল ফাঁদে পড়ে স্কুলশিক্ষার্থী, তরুণ, প্রান্তিক শ্রমজীবী থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরাও সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। আর্থিক দেউলিয়া পন, পারিবারিক ভাঙন ও আত্মহত্যার মতো সামাজিক বিপর্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি এই জুয়ার আড়ালে দেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের প্রত্যন্ত জেলা থেকে শুরু করে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প এলাকাগুলোতেও অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক অত্যন্ত সক্রিয়। মাঠপর্যায়ের চিত্র অনুযায়ী, এই আসক্তির কারণে চুরি, ছিনতাই ও পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জুয়ার ঋণের চাপ সহ্য করতে না পেরে দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি ধারের টাকা ফেরত না পেয়ে বন্ধুকে হত্যার মতো নৃশংস অপরাধও সংঘটিত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্রমাগত অভিযান সত্ত্বেও মূল হোতারা পর্দার আড়ালে থেকে যাওয়ায় এই চক্রের বিস্তার রোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতাকে কাজে লাগিয়ে সিকে৪৪৪, সিভি৬৬৬, নগদ৮৮, ক্রিক্রিয়া, ওয়ানএক্সবেট, বাবু৮৮ ও লাইনবেটের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অ্যাপের মাধ্যমে এসব জুয়ার আসর পরিচালিত হচ্ছে। বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে সহজে টাকা জমা ও উত্তোলনের সুযোগ থাকায় সাধারণ মানুষ দ্রুত এতে প্রলুব্ধ হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের মতে, আগে বিদেশি মুদ্রা বা ডলারের মাধ্যমে লেনদেন করতে হতো বলে গ্রাহক সীমিত ছিল। কিন্তু এখন স্থানীয় মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা স্থানান্তরের সুবিধা থাকায় এবং শুরুতে সামান্য মুনাফার লোভ দেখিয়ে অ্যাপগুলো ব্যবহারকারীদের স্থায়ীভাবে আসক্ত করে তুলছে।
অনুসন্ধানের গভীর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি শক্তিশালী বহুমাত্রিক এজেন্ট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। আন্তর্জাতিক চক্রের অধীনে দেশে মাস্টার এজেন্ট, সাব-এজেন্ট এবং স্থানীয় প্রতিনিধিরা কাজ করে। খেলোয়াড়রা অর্থ হারালে এই এজেন্টরা নির্দিষ্ট হারে কমিশন পায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা তৈরি বিভিন্ন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের ভুয়া ভিডিও বা ডিপফেক ব্যবহার করে নতুন গ্রাহকদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। দেশের সীমান্তবর্তী এবং অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল জেলাগুলোতে এই নেটওয়ার্ক সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত। মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কোনো বৈধ আয় না থাকলেও জুয়ার এজেন্ট হিসেবে কাজ করে অনেক তরুণের রাতারাতি বিলাসবহুল জীবনযাপনের তথ্য মিলেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান, এই বেটিং অ্যাপগুলোর মূল সার্ভার বা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রগুলো রাশিয়া বা অন্যান্য বিদেশে অবস্থিত হওয়ায় মূল অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা অত্যন্ত জটিল। দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় এজেন্টদের গ্রেপ্তার করা হলেও আইনি ফাঁকফোকর ও দুর্বলতার কারণে তারা দ্রুত জামিনে মুক্তি পেয়ে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। মেহেরপুর, কক্সবাজার ও যশোর অঞ্চলে জুয়া সিন্ডিকেটের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েও জামিনে বেরিয়ে বিদেশে পালিয়ে গেছে কিংবা স্থানীয়ভাবে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করেছে।
অনলাইন জুয়ার এই বিশাল লেনদেনের বড় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে দেশের প্রধান মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসগুলো। অনেক ক্ষেত্রে এজেন্ট ও সাধারণ হিসাবগুলোতে দিনে একাধিকবার বড় অঙ্কের অস্বাভাবিক লেনদেন হতে দেখা যায়। তবে এমএফএস খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অবৈধ জুয়া, হুন্ডি ও অর্থ পাচার রোধে তারা নিজস্ব প্রযুক্তির মাধ্যমে কঠোর নজরদারি চালাচ্ছেন। কোনো হিসাবে সন্দেহজনক লেনদেন পরিলক্ষিত হলে তা তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) রিপোর্ট করা হয়।
সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল পুলিশি অভিযান বা আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এই ডিজিটাল অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনকে সম্মিলিতভাবে তরুণ সমাজের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সাথে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাইবার নজরদারি আরও জোরদার করা জরুরি। এখনই কঠোর ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে এই অনলাইন জুয়া দেশের অর্থনীতি ও সামগ্রিক সামাজিক কাঠামোর জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি ও অপূরণীয় সংকটের সৃষ্টি করবে।
সোর্সঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন


