গ্রিনল্যান্ডে দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন সেনা উপস্থিতি ও খনিজ সম্পদে প্রভাব বিস্তারের কৌশল

গ্রিনল্যান্ডে দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন সেনা উপস্থিতি ও খনিজ সম্পদে প্রভাব বিস্তারের কৌশল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানের সঙ্গে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে নতুন কৌশলগত পরিকল্পনা সাজাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। স্বায়ত্তশাসিত এই দ্বীপটি যদি ভবিষ্যতে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তাহলেও সেখানে স্থায়ীভাবে মার্কিন সেনা মোতায়েন এবং খনিজ সম্পদে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে ওয়াশিংটনে চার মাস ধরে একটি গোপন আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র, গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের প্রতিনিধিদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকের তথ্য সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্যমতে, চলমান এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রিনল্যান্ড নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের পূর্ববর্তী সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি থেকে সরে এসে একটি সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক পথ তৈরি করা, যাতে ন্যাটো জোটের শরিকদের মধ্যে সম্ভাব্য উত্তেজনা হ্রাস করা যায়। তবে প্রস্তাবিত শর্তগুলোর কারণে গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় নেতাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দ্বীপটিতে ওয়াশিংটনের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যাবে। অনেক স্থানীয় রাজনীতিবিদের মতে, ইরান সংকটের সাময়িক অবসান ঘটলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে কঠোর অবস্থানে ফিরতে পারে। এই বাস্তবতায় স্থানীয় নীতিনির্ধারকরা আগামী ১৪ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্মদিনসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখছেন।

কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র মূলত ১৯৫১ সালের একটি পুরোনো দ্বিপাক্ষিক সামরিক চুক্তি সংশোধনের চেষ্টা করছে। সংশোধিত চুক্তির আওতায় গ্রিনল্যান্ড পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করলেও সেখানে অনির্দিষ্টকালের জন্য মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের একটি বড় অংশের জনগণ এই উদ্যোগকে কার্যত ‘স্থায়ী সামরিক নিয়ন্ত্রণ’ হিসেবে দেখছেন, যা তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে খর্ব করতে পারে।

সামরিক উপস্থিতির পাশাপাশি এই আলোচনায় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ওয়াশিংটন চাইছে, গ্রিনল্যান্ডে যেকোনো বৃহৎ বৈদেশিক বিনিয়োগ বা চুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের যেন কার্যকর ‘ভেটো’ বা প্রত্যাহারের ক্ষমতা থাকে। এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো আর্কটিক বা সুমেরু অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত প্রবেশাধিকার বন্ধ করা। তবে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের প্রতিনিধিরা এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করছেন। একই সঙ্গে দ্বীপটির তেল, ইউরেনিয়াম, বিরল মৃত্তিকা (রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস) এবং অন্যান্য কৌশলগত খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও আলোচনা চলছে, যার একটি বড় অংশ এখনো বরফের নিচে রয়েছে।

এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগন ইতিমধ্যে দ্বীপটিতে তাদের সামরিক সম্প্রসারণের প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে। সম্প্রতি দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের নারসারসুয়াক এলাকায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর এবং সম্ভাব্য সেনা অবস্থানের স্থানগুলো পরিদর্শন করেছেন মার্কিন মেরিন কর্পসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। গ্রিনল্যান্ডের জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তারা মনে করছেন, এসব দাবি দ্বীপটির সার্বভৌমত্বে বড় ধরনের হস্তক্ষেপের শামিল। গ্রিনল্যান্ডের পার্লামেন্ট সদস্য জাস্টাস হ্যানসেন এ প্রসঙ্গে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সব দাবি মেনে নেওয়া হলে গ্রিনল্যান্ডের পক্ষে কখনোই প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব হবে না। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, দ্বীপটির প্রায় ৫৭ হাজার বাসিন্দাই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে ওয়াশিংটনে এই ত্রিপক্ষীয় প্রতিনিধি দল অন্তত পাঁচবার রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে এই আলোচনা অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে পরিচালনা করা হচ্ছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর নর্দার্ন কমান্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ার ফলে এই এলাকাটি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আলাস্কা ও কানাডার মতো গ্রিনল্যান্ডকেও মার্কিন রাডার ও সামরিক ঘাঁটির একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। মার্কিন বাহিনীর কৌশলগত অবস্থানের জন্য গ্রিনল্যান্ডে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বিশেষ সামরিক প্রশিক্ষণ ঘাঁটি গড়ে তোলা অপরিহার্য বলে মনে করছে পেন্টাগন।

এর আগে মার্কিন প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডকে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য হিসেবে অভিহিত করেছিল এবং একপর্যায়ে সামরিক শক্তি প্রয়োগের ইঙ্গিতও দিয়েছিল। বর্তমানে ইরানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ব্যস্ত থাকলেও, হোয়াইট হাউসের নীতিগত অবস্থান নির্দেশ করে যে আর্কটিক অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ওয়াশিংটন তার পূর্ব অবস্থান থেকে পিছু হঠেনি।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ