রাজনীতি ডেস্ক
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত ড. জালিল রহিমি জাহানাবাদি জাতীয় সংসদ ভবনের বিরোধীদলীয় নেতার কার্যালয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। বৈঠকে দুই দেশের ঐতিহাসিক ও ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক সুদৃঢ়করণ, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়, চিকিৎসা পর্যটন এবং মুসলিম বিশ্বের সমসাময়িক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় এই বৈঠকটি দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা ও কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও বেগবান করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
বৈঠকের শুরুতে ইরানের রাষ্ট্রদূত ড. জালিল রহিমি জাহানাবাদি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক সাফল্য এবং ডা. শফিকুর রহমান বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হওয়ায় তাকে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ অভিনন্দন জানান। রাষ্ট্রদূত একটি আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর কাঠামোগত, গঠনমূলক ও বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনৈতিক কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে তিনি দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে তেহরানের সদিচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করেন।
আলোচনাকালে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিশেষ ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপের ওপর জোর দেওয়া হয়। এর মধ্যে ঢাকা ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি বিমান ফ্লাইট চালু এবং উভয় দেশের আইনপ্রণেতাদের সমন্বয়ে একটি ‘পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপ’ বা সংসদীয় মৈত্রী দল গঠনের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি বিমান যোগাযোগ স্থাপিত হলে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং জনশক্তি খাতের দ্রুত বিকাশ ঘটবে। পাশাপাশি সংসদীয় মৈত্রী দল গঠনের মাধ্যমে দুই দেশের রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় আরও সহজতর হবে।
বৈঠকে বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতের উন্নয়নে একটি দূরদর্শী প্রস্তাব উত্থাপন করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বাংলাদেশে বিশ্বমানের একটি আধুনিক হাসপাতাল চালুর ব্যাপারে ইরান সরকারকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন। ইরান বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞান ও টেকনোলজিতে মুসলিম বিশ্বে অন্যতম অগ্রসর একটি দেশ। বাংলাদেশে এই ধরনের একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলে তা দেশের স্বাস্থ্য খাতের গুণগত মান বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি প্রসঙ্গে আলোচনাকালে সাম্প্রতিক যুদ্ধে নিহত ইরানের সকল নাগরিকের প্রতি গভীর দুঃখ ও সমবেদনা প্রকাশ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেন। যুদ্ধবিরতি ত্বরান্বিত করার স্বার্থে সম্প্রতি ইরান কর্তৃক সম্পাদিত শান্তি চুক্তির ভূয়সী প্রশংসা করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই শান্তি চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর থাকবে এবং ইরান আগামী দিনগুলোতে প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে ইতিবাচক ও ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
গুরুত্বপূর্ণ এই কূটনৈতিক বৈঠকে ইরানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকাস্থ ইরান দূতাবাসের ফার্স্ট কাউন্সেলর এসরাফিল আমিরি গোরজাদ্দিনি, ইরান কালচারাল কাউন্সেলর মাহদি মোলারস এবং মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশন্স অফিসার (দোভাষী) মাহফুজুল হক। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষে উপস্থিত ছিলেন তার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান এমপি এবং পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য আলী আহমাদ মাবরুর।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উচ্চপর্যায়ের সাক্ষাৎটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিরোধীদলীয় নেতার কার্যালয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের এই আনুষ্ঠানিক বৈঠক বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চাকে যেমন প্রতিফলিত করে, তেমনি ইরান-বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে আরও বিস্তৃত করার পথ সুগম করে।


