অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনতে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো ‘মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল’ (ফ্রি ট্রেড জোন) প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে সরকার। প্রাথমিকভাবে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নিকটবর্তী মোট ৬০০ একর জমিতে এই বিশেষ অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। এছাড়া, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ‘চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ (সিইআইজেড) স্থাপনের লক্ষ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বুধবার সকালে সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত এবং অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভা শেষে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি সরকারের এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, প্রস্তাবিত এই মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে প্রচলিত কাস্টমসের কঠোর নিয়মকানুন কার্যকর থাকবে না। এটি সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। মূলত আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজতর করা এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে এর একটি সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখবে।
একই সভায় চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রস্তাবিত ‘চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ স্থাপনের অগ্রগতি সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। এই শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্পেশাল পারপাস কোম্পানির সঙ্গে ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট’ (উন্নয়ন চুক্তি) এবং ‘ল্যান্ড লিজ অ্যাগ্রিমেন্ট’ (ভূমি ইজারা চুক্তি) অনুমোদন ও স্বাক্ষরের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই জোনের কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু হলে দেশের অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে এবং বহুমুখী পণ্যের উৎপাদন, ক্রয়-বিক্রয় তথা সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিধি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে সৃষ্ট সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পূর্ববর্তী দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অনুযায়ী বিভিন্ন দেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং জ্বালানি তেল আমদানি বিঘ্নিত হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে বর্তমানে স্পট মার্কেট (খোলা বাজার) থেকে চড়া মূল্যে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে।
তবে সংকট সত্ত্বেও দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শিক্ষা। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল ও গ্যাস ক্রয়ের যে প্রচলিত ব্যবস্থা বা পদ্ধতি রয়েছে, তা পুনর্মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে যেকোনো বৈশ্বিক সংকটে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়।
এছাড়া, দেশের কৃষি উৎপাদন ব্যাহত না করার লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ চাহিদার জোগান দিতে রাশিয়া থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানির একটি প্রস্তাবও এই সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গঠন এবং চীনা শিল্পাঞ্চলের চুক্তি অনুমোদনের এই সিদ্ধান্তগুলো বর্তমান বৈশ্বিক মন্দা পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও বাণিজ্যে নতুন গতি সঞ্চার করবে। বিশেষ করে কাস্টমসমুক্ত সুবিধার কারণে মাতারবাড়ী ও চট্টগ্রাম বন্দর কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।


