জাতীয় সংবাদ ডেস্ক
দেশে চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শুধু চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর না করে নার্স ও মিডওয়াইফারি (ধাত্রীবিদ্যা) খাতের ঘাটতি পূরণের তাগিদ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে নার্স ও মিডওয়াইফের ব্যাপক সংকট রয়েছে, যা নিরসনে বিদ্যমান জনবল আরও ৩ থেকে ৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশের চিকিৎসকদের বড় একটি অংশ শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠী কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ঢাকায় জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (নিপোর্ট) আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সেমিনারে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জ, জনবল কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী দেশের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবার ভৌগোলিক অসমতার চিত্র তুলে ধরে বলেন, “বর্তমানে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ চিকিৎসক শহর অঞ্চলে অবস্থান করছেন। অথচ বাস্তব চিত্র হলো, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করেন।” শহরের তুলনায় গ্রামীণ অঞ্চলে চিকিৎসকদের এই অনুপস্থিতি প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিকে কঠিন করে তুলছে। এই ভারসাম্যহীনতা দূর করতে সরকারি নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন ও চিকিৎসকদের গ্রামীণ অঞ্চলে ধরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সেমিনারে চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের মতো উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীদের বিদেশে অভিবাসন এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন ডা. এম এ মুহিত। তিনি বলেন, দেশের বড় চাকরিজীবীরা প্রবাস থেকে তুলনামূলক কম রেমিট্যান্স পাঠান। মূলত সাধারণ শ্রমজীবী মানুষেরাই দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে সিংহভাগ রেমিট্যান্স পাঠিয়ে থাকেন। তাই চিকিৎসক ও প্রকৌশলীরা বেশি সংখ্যায় বিদেশে গেলে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে—এমন ধারণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন তিনি। তবে উচ্চশিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং গবেষণার উদ্দেশ্যে চিকিৎসকদের বিদেশে যাওয়াকে স্বাগত জানান প্রতিমন্ত্রী। দেশের অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বর্তমান চাহিদার কথা উল্লেখ করে তিনি স্পষ্ট করেন যে, বাংলাদেশ থেকে এই মুহূর্তে চিকিৎসক ও নার্স স্থায়ীভাবে বিদেশে রপ্তানি করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে ডা. এম এ মুহিত বলেন, যেকোনো ধরনের সংক্রামক ব্যাধি ও সম্ভাব্য মহামারি প্রতিরোধে পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করছে সরকার। ভবিষ্যতের এই স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য জাতীয় বাজেটেও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও বিশেষ খাত যুক্ত করা হয়েছে। চিকিৎসকদের পাশাপাশি নার্সিং খাতের আধুনিকায়ন এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো ও সেবার মান বাড়াতে পারলে দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্য দেশের স্বাস্থ্য খাতের কিছু দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকটকে নির্দেশ করে। বিশেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী চিকিৎসক ও নার্সের যে অনুপাত থাকা প্রয়োজন, বাংলাদেশে তা এখনো অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এই সংকট দূরীকরণে নার্সিং শিক্ষার মান উন্নয়ন, নতুন পদ সৃষ্টি এবং চিকিৎসকদের গ্রামীণ এলাকায় নিয়োজিত করতে পারলে দেশের স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক চিত্র বদলে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।


