জাতীয় ডেস্ক
বিদেশে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে প্রতারণা ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরছেন অসংখ্য নারী। সম্প্রতি সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া বাংলাদেশি নারীদের একটি টিস্যু কোম্পানির আড়ালে পরিচালিত চক্রের মাধ্যমে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। দালাল চক্রের এই সংগঠিত অপরাধের কারণে গত সাত বছরে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন, যা দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতে চরম উদ্বেগ তৈরি করেছে।
২০২৫ সালে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় সৌদি আরবে যান শিউলি (ছদ্মনাম) নামের এক নারী। সেখানে প্রাথমিক কর্মস্থলে নির্যাতনের শিকার হয়ে চাকরি পরিবর্তনের চেষ্টা করলে দালালেরা তাকে একটি টিস্যু কোম্পানিতে ভালো কাজের প্রলোভন দেখায়। তবে সেখানে তাকে আটকে রেখে জোরপূর্বক যৌন কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করা হয়। ভুক্তভোগী জানান, একটি কক্ষে অবরুদ্ধ করে তাকে নিয়মিত মারধর ও অমানবিক নির্যাতন করা হতো, পর্যাপ্ত খাবার এবং অসুস্থতায় চিকিৎসা দেওয়া হতো না। উপর্যুপরি যৌন নির্যাতনের কারণে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে পাঁচ মাস কারাভোগের পর দেশে ফিরে তিনি সন্তান জন্ম দেন। করোনায় স্বামীকে হারানোর পর পরিবারের দায়িত্ব নিতেই তিনি বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন।
এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের ওপর চলমান নিপীড়নের একটি অংশ মাত্র। সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শুধু মধ্যপ্রাচ্য থেকেই প্রায় ২ হাজার নারী কর্মী নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের তথ্যমতে, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী দেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন, যাদের একটি বড় অংশই কর্মক্ষেত্রে কোনো না কোনোভাবে শারীরিক, মানসিক বা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে অন্তত ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে।
নারী কর্মীদের পাশাপাশি পুরুষ কর্মীদের ক্ষেত্রেও অবৈধ অভিবাসন ও প্রতারণার চিত্র ভয়াবহ। ২০২৫ সালে বিশ্বের ৮০টি দেশ থেকে প্রায় ৭৪ হাজার পুরুষ কর্মী দেশে ফেরত আসেন, যাদের অধিকাংশই বৈধ কাগজপত্র ছাড়া বিদেশে অবস্থান করছিলেন। এছাড়া ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত চার মাসেই আরও প্রায় ২৪ হাজার কর্মী দেশে ফিরেছেন, যার মধ্যে ২৩ হাজারের বেশি পুরুষ।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে কর্মী প্রেরণের পুরো প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। বিশেষ করে নারী কর্মীদের পাঠানোর আগে যথাযথ প্রশিক্ষণ, মানসিক প্রস্তুতি এবং গন্তব্য দেশের আইন সম্পর্কে সচেতনতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে, নির্যাতনের শিকার কর্মীরা দেশে ফেরার পর যেন দ্রুত আইনি সহায়তা ও বিচার পান, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসের মাধ্যমে প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অপরাধী চক্রকে চিহ্নিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই সংকট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জানান, কোনো ব্যক্তি, রিক্রুটিং এজেন্সি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কর্মী নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সৌদি আরব ও ওমানসহ প্রধান প্রধান শ্রমবাজারে স্থানীয় লিগ্যাল ফার্মের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের আইনি সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার ফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে শুরু করেছে।
বিদেশে কর্মসংস্থানের আড়ালে মানব পাচার এবং ছদ্মবেশী দালাল চক্রের এই তৎপরতা দেশের প্রবাসী আয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসন নিশ্চিত করতে দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, বিদেশে কূটনৈতিক নজরদারি বৃদ্ধি এবং ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।


