জাতীয় ডেস্ক
বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রযুক্তিগত আসক্তি, সামাজিক চাপ এবং বেকারত্বজনিত হতাশা। তবে এই বিশাল মানসিক স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় দেশের চিকিৎসা অবকাঠামো, প্রয়োজনীয় বাজেট এবং বিশেষজ্ঞ জনবলের চরম ঘাটতি রয়েছে, যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইএমএইচ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শিশু-কিশোর ও তরুণদের একটি বড় অংশ মাদকাসক্তি, সোশ্যাল মিডিয়া, ইন্টারনেট, গেমিং এবং পর্নোগ্রাফি আসক্তিতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য আসছেন। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি গেমিং বা ইন্টারনেট আসক্তির ফলে মূলত তরুণ ও শিশুদের মস্তিষ্কের ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’-এর গঠনগত পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে তাদের বিচারবোধ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা লোপ পায় এবং আচরণে চরম আবেগহীনতা বা উগ্রতা তৈরি হয়, যা অনেক সময় পারিবারিক সহিংসতা এমনকি আত্মহত্যার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত করে।
মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের আরেকটি প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে যুবসমাজের দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব ও ক্যারিয়ারের চাপ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, দেশে শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা বর্তমানে অন্যতম বড় একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ। পড়াশোনা শেষ করে দীর্ঘ সময় চাকরি না পাওয়া, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বিপুল সংখ্যক তরুণ তীব্র হতাশায় ভুগছেন। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্বকে সমাজ যখন ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখে, তখন সমস্যার মূল অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত কারণটি আড়ালে চলে যায়। শিল্পনীতি, শিক্ষানীতি এবং শ্রমবাজারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে রাষ্ট্রের কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে তরুণদের এই মানসিক বিপর্যয় রোধে সাময়িক আর্থিক নিরাপত্তা হিসেবে বেকারত্ব ভাতা চালু করা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
এদিকে চাহিদার তুলনায় দেশের মানসিক স্বাস্থ্য খাতের চিকিৎসাব্যবস্থা ও অবকাঠামো অত্যন্ত অপ্রতুল। দেশে বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রায় ১৭ শতাংশের পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন, যা জনসংখ্যার হিসাবে সোয়া দুই কোটিরও বেশি। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য সারা দেশে মাত্র ৩০০ জনের মতো মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ আছেন, যার মধ্যে প্রায় ২০০ জনই রাজধানী ঢাকাভিত্তিক। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য যেখানে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ থাকার কথা, সেখানে বাংলাদেশে এই অনুপাত মাত্র ০.২১ থেকে ০.২৫ জন। ফলে আক্রান্তদের মধ্যে ৯২ শতাংশেরই বেশি মানুষ চিকিৎসাবঞ্চিত থাকছেন।
সারাদেশে সরকারি পর্যায়ে বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতাল রয়েছে মাত্র দুটি—রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ৪০০ শয্যার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইএমএইচ) এবং ৫০০ শয্যার পাবনা মানসিক হাসপাতাল। কিন্তু এই হাসপাতালগুলোও তীব্র জনবল ও প্রশাসনিক সংকটে জর্জরিত। উদাহরণস্বরূপ, এনআইএমএইচ ২০২১ সালে ৪০০ শয্যায় উন্নীত হলেও এখনো পূর্বের ২০০ শয্যার জনবল দিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে ‘ইলেক্ট্রো কনভালসিভ থেরাপি’ (ইসিটি) সেবা। এ ছাড়া ল্যাবরেটরির জরাজীর্ণ যন্ত্রপাতি এবং পুরো হাসপাতালে মাত্র একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের উপস্থিতি সেবাদান প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে। দৈনিক বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে চার শতাধিক রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এই সংকটের মূল ভিত্তি নিহিত রয়েছে অপর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ অনুযায়ী মোট স্বাস্থ্য বাজেটের ৫ থেকে ১০ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা উচিত হলেও, বাংলাদেশে এই বরাদ্দের পরিমাণ মাত্র ০.৪৪ থেকে ০.৫০ শতাংশ। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভুটানে এই খাতের বাজেট মোট স্বাস্থ্য বাজেটের ৪ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন কেবল একক কোনো মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের বিশেষায়িত শিক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের পুনর্বাসনের জন্য যথাক্রমে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাথে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যকর আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় প্রয়োজন।
এর বাইরে আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলো সামাজিক কুসংস্কার বা ‘ট্যাবু’। শারীরিক অসুস্থতায় মানুষ যেভাবে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়, মানসিক রোগের ক্ষেত্রে লোকলজ্জার ভয়ে তা গোপন রাখা হয়। ফলে তরুণরা তীব্র মানসিক যন্ত্রণা নিয়েও সেবা নিতে আগ্রহী হয় না।
তবে এই সংকটের মধ্যেও কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজগুলোতে ‘মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম’ চালুর প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি ইউজিসি ও ইউনেস্কোর যৌথ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের জন্য ‘সোশ্যাল-ইমোশনাল লার্নিং প্যাকেজ’ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের অধীনে ‘হেলথ প্রোমোটিং স্কুল’ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। ২০২৮ সালের নতুন শিক্ষাক্রমের পাঠ্যপুস্তকে মানসিক ও সামাজিক-আবেগীয় সুস্থতার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একটি মানসিক স্বাস্থ্য নির্দেশিকাও তৈরি করা হয়েছে।
প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ও পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতায় তরুণদের এই গভীর মানসিক সংকট থেকে রক্ষা করতে রাষ্ট্রীয় নীতিগত সংস্কার, চিকিৎসা অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।


