জাতীয় সংসদ ডেস্ক
জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্যদের (এমপি) আবাসিক ফ্ল্যাটে পর্দা, ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেন দেওয়ার দাবি এবং এর প্রেক্ষিতে পাল্টা উপহার দেওয়ার প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বাজেট অধিবেশনের আলোচনায় এক সংসদ সদস্যের উত্থাপিত দাবির বিপরীতে অন্য এক সংসদ সদস্যের কঠোর সমালোচনা ও পাল্টা প্রস্তাবের পর পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পিকার ও বিরোধীদলীয় নেতাকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।
গত বুধবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান এমপিদের আবাসন সুবিধার বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি অভিযোগ করেন, সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটের দরজা-জানালায় এখনো পর্দা লাগানো হয়নি। একই সঙ্গে তিনি এমপিদের ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেন দেওয়ার পূর্বশ্রুতির কথা উল্লেখ করে তা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান। দেশের অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে জনপ্রতিনিধিদের এমন সুযোগ-সুবিধার দাবি জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।
এই বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে বৃহস্পতিবার সংসদের পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি বলেন, এ ধরনের সুযোগ-সুবিধার দাবি গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ায় সামগ্রিকভাবে জাতীয় সংসদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। যেখানে দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে গাড়ি ও প্লট না নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা চলছে, সেখানে মাইক্রোওভেন ও ওয়াশিং মেশিনের মতো ছোটখাটো বিষয় নিয়ে সংসদের মূল্যবান সময় নষ্ট করা এবং দাবি তোলা অযৌক্তিক। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রয়োজনে তিনি নিজেই ওই সংসদ সদস্যকে পর্দা ও মাইক্রোওভেন কিনে দিতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে তিনি এ ধরনের চর্চা বন্ধের আহ্বান জানান।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হস্তক্ষেপ করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। তিনি আন্দালিব রহমান পার্থর বক্তব্যকে পয়েন্ট অব অর্ডারের পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করলেও সামগ্রিক বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন। স্পিকার বলেন, বাজেট আলোচনায় সংসদ সদস্যরা যেকোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারেন এবং মিজানুর রহমান কোনো সংসদীয় অপরাধ করেননি। তিনি কেবল নিজের জন্য নয়, বরং সব সংসদ সদস্যের আবাসন সংকটের কথা তুলে ধরেছেন। তবে স্পিকার সংসদকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, আবাসন বা ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার মতো বিষয়গুলো সংসদের মূল অধিবেশনে আলোচনা না করে ‘হাউজ কমিটি’র মাধ্যমে উত্থাপন করাই শ্রেয়। এতে জনমনে কোনো প্রকার বিভ্রান্তি বা নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয় না।
পরবর্তীতে বিতর্কের রেশ ধরে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সংসদে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে যেকোনো বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় সদস্যদের পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদা বজায় রাখা আবশ্যক। কাউকে ব্যক্তিগতভাবে বিব্রত না করে সংযত আচরণের ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে সংসদীয় রীতিনীতি রক্ষায় ভবিষ্যতে সবাইকে আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় বাজেট অধিবেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জনপ্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত ও আবাসন সুবিধা নিয়ে এমন বিতর্ক সংসদের মূল এজেন্ডা থেকে দৃষ্টি বিচ্যুত করে। সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী হাউজ কমিটির বৈঠকই এসব বৈষয়িক সমস্যা সমাধানের উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম। মূল অধিবেশনে এ ধরনের দাবি-পাল্টা দাবি জনমনে জনপ্রতিনিধিদের অগ্রাধিকার নিয়ে নেতিবাচক বার্তা পাঠাতে পারে, যা এড়াতে স্পিকারের দেওয়া পরামর্শ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।


