ইরানে রসায়নিক জাহাজ আগমনের মধ্যপ্রাচ্য ভূরাজনৈতিক প্রভাব

ইরানে রসায়নিক জাহাজ আগমনের মধ্যপ্রাচ্য ভূরাজনৈতিক প্রভাব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে চীনের কয়েকটি রাসায়নিক বহনকারী জাহাজ ইরানে পৌঁছেছে বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। এই ঘটনাকে কেবল সামরিক সরবরাহ হিসেবে নয়, বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের ঝুহাই শহরের গাওলান বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করা এসব জাহাজ ইরানের বন্দরে পৌঁছেছে। জাহাজগুলোতে সোডিয়াম পারক্লোরেট বহন করা হয়েছে, যা কঠিন জ্বালানিভিত্তিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পরিমাণ কাঁচামাল দিয়ে শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি সম্ভব, যা ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মার্কিন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, চলমান সংঘাতের পর্যায়ে ইরান দ্রুত তাদের ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, ইরানের প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এখনও অক্ষত রয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে, ইরান আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও উৎপাদন ক্ষমতা পুরোপুরি হারায়নি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান বিকল্প বা ছড়ানো উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এসব জাহাজ ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান শিপিং লাইন গ্রুপ-এর আওতাভুক্ত। নজরদারি এড়াতে জাহাজগুলোতে স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (AIS) বন্ধ রাখা, ভুয়া গন্তব্য দেখানো এবং নাম পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব কৌশল আন্তর্জাতিক নজরদারিকে সীমিত করতে সহায়ক হয়েছে।

সরবরাহকৃত কাঁচামাল সময়ের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। চলমান সংঘাতে ইরান ব্যাপকভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে এবং মজুদ দ্রুত কমছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কারণে উৎপাদন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই নতুন কাঁচামাল আমদানি ইরানকে অন্তত কয়েকদিন আরও হামলা চালানোর সক্ষমতা দেবে।

দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানা যায়, ‘গোলবান’ ও ‘জাইরান’ নামের দুটি জাহাজে আনা কাঁচামাল দিয়ে ইরান প্রায় ৭৮৫টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। এর অর্থ, যুদ্ধ পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের অনুমান অনুযায়ী, ইরান প্রতিদিন ১০ থেকে ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ অব্যাহত রাখতে সক্ষম হতে পারে।

চীনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চীন আনুষ্ঠানিকভাবে সরাসরি সামরিক সহায়তার কথা অস্বীকার করলেও, বাণিজ্যিক পণ্যের আড়ালে কাঁচামাল সরবরাহ অব্যাহত রাখছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই কৌশলের মাধ্যমে বেইজিং আন্তর্জাতিক চাপ এড়াতে সক্ষম হচ্ছে এবং ইরানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে পারছে। এ ধরনের কৌশল চীন রাশিয়ার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে চীনের জন্য এটি একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার বিষয়। ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা চালাচ্ছে, যেখানে বেইজিং বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে বড় বিনিয়োগ করেছে। এ পরিস্থিতিতে চীনের ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ