বিদ্যুৎ খাতের পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে কাজ শুরু করেছে সরকার

বিদ্যুৎ খাতের পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে কাজ শুরু করেছে সরকার

অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের বিদ্যুৎ খাতে ‘কুইক রেন্টাল’ প্রকল্পের আড়ালে লুণ্ঠিত ও বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন যে, এই অর্থ পুনরুদ্ধারে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে কাজ করছে।

রবিবার (১৯ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৬তম দিনে প্রশ্নোত্তর পর্বে পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য তুলে ধরেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

বিশেষ আইনের অপব্যবহার ও আর্থিক অনিয়ম
সংসদে পেশকৃত তথ্যানুযায়ী, ২০১০ সালে প্রণীত ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক অনিয়মের সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। এই আইনের অধীনে কোনো ধরনের উন্মুক্ত দরপত্র বা স্বচ্ছ ক্রয় প্রক্রিয়া ছাড়াই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদনের অবারিত সুযোগ ছিল। মন্ত্রী জানান, আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী গঠিত নেগোসিয়েশন কমিটির মাধ্যমে ট্যারিফ বা বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হতো। এই কাঠামোর সুযোগ নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক বাজার দরের পরিবর্তে অন্যায্য উচ্চমূল্য এবং অস্বাভাবিক ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ নির্ধারণ করে সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থ পাচার
তদন্ত ও প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের বরাতে জানানো হয়, এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সাথে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা এবং তাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনরা সরাসরি যুক্ত ছিলেন। স্বচ্ছতার অভাব থাকায় এই খাতের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জিত হয় এবং পরবর্তীতে তা বিদেশে পাচার করা হয়। বিদ্যুৎ খাতের এই কাঠামোগত দুর্নীতিকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় ক্ষত হিসেবে চিহ্নিত করেছে বর্তমান সরকার।

আইনি সংস্কার ও বর্তমান পদক্ষেপ
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদ্যুৎ খাতের বিতর্কিত ‘বিশেষ বিধান’ আইনটি বাতিল করে অধ্যাদেশ জারি করেছিল। সংসদীয় প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় গত ৭ এপ্রিল উক্ত অধ্যাদেশটি জাতীয় সংসদে বিল আকারে পাস হয়। এর ফলে ভবিষ্যতে উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মতো স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের পথ বন্ধ হয়েছে।

মন্ত্রী আরও জানান, শুধুমাত্র আইন সংশোধন নয়, বরং অতীতে যারা এই খাতের মাধ্যমে দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করেছে, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও আইনি যোগাযোগ রক্ষা করছে অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বিদ্যুৎ খাতের এই সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের করের অর্থের অপচয় রোধ করাই সরকারের মূল লক্ষ্য বলে অধিবেশনে জানানো হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই অর্থ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া সফল হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ