আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে ইরানকে পাশ কাটিয়ে বা তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখে বিনামূল্যে নিরাপত্তা পাওয়া সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে দেশটি। ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ এক কঠোর বার্তায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে এই হুঁশিয়ারি প্রদান করেন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিবৃতিতে মোহাম্মদ রেজা আরেফ বলেন, ইরানের তেল রপ্তানিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে অন্য দেশগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের প্রত্যাশা করবে—এটি কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, ইরান যদি নিজের ন্যায্য অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তবে ওই অঞ্চলে জ্বালানি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
ইরানি ভাইস প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে রয়েছে এবং পশ্চিমা বিশ্বের সাথে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। আরেফ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, তেলের বাজার হয় সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত রাখতে হবে, অন্যথায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে বড় ধরনের মাশুল গুণতে হতে পারে।
জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা ও ভূ-রাজনীতি
বিশ্বের মোট ব্যবহৃত খনিজ তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথটি পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহের প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত। ইরান দীর্ঘকাল ধরেই এই প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে আসছে।
মোহাম্মদ রেজা আরেফের মতে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়টি সরাসরি ইরান ও তার মিত্রদের ওপর থেকে অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ হ্রাসের সাথে সম্পৃক্ত। তিনি মনে করেন, তেহরানের ওপর আরোপিত একতরফা নিষেধাজ্ঞাগুলো কেবল ইরানের অর্থনীতির ক্ষতি করছে না, বরং তা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এক বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই হুঁশিয়ারি মূলত পশ্চিমা বিশ্বের ওপর পাল্টা চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল, যাতে তারা দেশটির ওপর থেকে বাণিজ্যিক অবরোধ শিথিল করতে বাধ্য হয়।
সম্ভাব্য প্রভাব ও আঞ্চলিক উদ্বেগ
ইরানের পক্ষ থেকে আসা এই কড়া বার্তা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। যদি হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের অস্থিরতা বা নৌ-চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও প্রকট হতে পারে।
উল্লেখ্য, অতীতেও বিভিন্ন সময় ইরান এই প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। বিশেষ করে যখনই দেশটির তেল রপ্তানির ওপর কোনো বাধা এসেছে, তখনই তেহরান এই কৌশলগত জলপথটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। তবে এবারের হুঁশিয়ারিটি আরও সরাসরি এবং এটি বিশ্বনেতাদের প্রতি একটি স্পষ্ট সংকেত যে, ইরান তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরানের এই অবস্থান থেকে সরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ যদি না আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো সমঝোতা বা সংলাপের পথ তৈরি হয়। আপাতত হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক তৎপরতা কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব সম্প্রদায়।


