আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাজ্যে তামাকমুক্ত ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশটির সংসদের উচ্চ ও নিম্ন—উভয় কক্ষে ‘টোব্যাকো অ্যান্ড ভেপস বিল’ পাস হয়েছে। এই আইনের অধীনে ১৭ বছর বা তার কম বয়সীদের কাছে স্থায়ীভাবে সিগারেট বিক্রি নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং এই পদক্ষেপকে ‘জাতির স্বাস্থ্যের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্য বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে একটি সম্পূর্ণ ‘ধূমপানমুক্ত প্রজন্ম’ তৈরির পথে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করল।
আইনের মূল লক্ষ্য ও প্রয়োগ
নতুন এই আইনের মূল লক্ষ্য হলো ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারির পরে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিদের কাছে কখনোই তামাকজাত পণ্য বিক্রি করতে না দেওয়া। বর্তমানে যাদের বয়স ১৭ বছর বা তার কম, তারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরেও বৈধভাবে সিগারেট কিনতে পারবেন না। আইনটি রাজকীয় অনুমোদন (রয়্যাল অ্যাসেন্ট) পাওয়ার পর কার্যকর হবে। মূলত তামাকের আসক্তি থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আজীবন সুরক্ষিত রাখাই এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার উদ্দেশ্য।
এই আইনের আওতায় সরকার কেবল তামাক বিক্রি নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং ধূমপানের জায়গার ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে। বিশেষ করে শিশুদের খেলার মাঠ, স্কুল এবং হাসপাতালের বাইরের মতো উন্মুক্ত স্থানেও ধূমপান নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা পাবে প্রশাসন।
ভেপিং নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধিনিষেধ
সিগারেটের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভেপিং বা ই-সিগারেটের আসক্তি কমাতেও এই বিলে কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ভেপিং পণ্যের স্বাদ (ফ্লেভার) এবং প্যাকেজিংয়ের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হবে, যাতে এগুলো কিশোর-কিশোরীদের আকৃষ্ট করতে না পারে। এছাড়া যেসব পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ, সেখানে ভেপিংয়ের ওপরও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। উল্লেখ্য, গত বছরের জুন মাসে দেশটির সরকার ডিসপোজেবল বা একবার ব্যবহারযোগ্য ভেপ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, যা সস্তা এবং আকর্ষণীয় মোড়কের কারণে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
স্বাস্থ্য খাতে প্রভাব ও পটভূমি
ব্রিটিশ জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা ‘এনএইচএস’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে প্রতি বছর প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ ধূমপানজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এটি দেশটির মোট মৃত্যুর প্রায় এক-চতুর্থাংশ। দীর্ঘমেয়াদে তামাকের ব্যবহার বন্ধ হলে ক্যানসার, হৃদরোগ এবং ফুসফুসের জটিলতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই আইন বাস্তবায়িত হলে স্বাস্থ্য খাতের ওপর বিদ্যমান বিপুল আর্থিক ও জনবল সংকট হ্রাস পাবে।
জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থাগুলো এই বিলকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এটি জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তামাক আসক্তি কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের বোঝা তৈরি করে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
ধূমপান নির্মূলে এমন কঠোর আইন প্রণয়নের চেষ্টা বিশ্বে এটিই প্রথম নয়। ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ড প্রথম দেশ হিসেবে ২০০৮ সালের পর জন্মগ্রহণকারীদের কাছে তামাক বিক্রি নিষিদ্ধ করে আইন পাস করেছিল। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে ২০২৩ সালের নভেম্বরে দেশটির রক্ষণশীল জোট সরকার সেই আইনটি বাতিল করে দেয়। অন্যদিকে, গত বছরের নভেম্বরে মালদ্বীপও ২০০৭ সালের পর জন্মগ্রহণকারীদের জন্য সিগারেট কেনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ মনে করছেন, ব্রিটেনের এই সিদ্ধান্ত তামাক নিয়ন্ত্রণে বিশ্বজুড়ে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে, যা অন্যান্য উন্নত দেশগুলোকেও অনুপ্রাণিত করতে পারে।
মূলত জনস্বাস্থ্যের মানোন্নয়ন এবং একটি সুস্থ ও দীর্ঘজীবী প্রজন্ম নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই ব্রিটেন এই কঠোর কিন্তু দূরদর্শী আইনটি পাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আইনটি কার্যকর হওয়ার পর এর প্রয়োগ এবং তামাক চোরাচালান রোধে ব্রিটিশ সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো বিশ্বজুড়ে পর্যবেক্ষণে থাকবে।


