আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং ইরানের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রথমবারের মতো দেশটিতে অত্যাধুনিক ‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে ইসরায়েল। সামরিক সরঞ্জামাদির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবলও দেশটিতে পাঠানো হয়েছে। ইসরায়েলি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সম্প্রতি এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। কূটনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে নিজ ভূখণ্ডের বাইরে অন্য কোনো রাষ্ট্রে ইসরায়েলের এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের ঘটনা এটিই প্রথম, যা দুই দেশের কৌশলগত ও গোয়েন্দা সহযোগিতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক অস্থিরতা শুরুর পর থেকেই সংযুক্ত আরব আমিরাত নানাবিধ নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুখীন হয়ে আসছে। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরান থেকে দেশটির ওপর এ পর্যন্ত প্রায় ৫৫০টি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজার ২০০টিরও বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছে। যদিও আমিরাতের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে অধিকাংশ আক্রমণ সফলভাবে নস্যাৎ করা হয়েছে, তবুও বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত হানতে সক্ষম হয়। এই ধারাবাহিক হামলার মুখে নিরাপত্তা ঝুঁকি হ্রাসে আমিরাত সরকার তার মিত্র রাষ্ট্রগুলোর কাছে জরুরি ভিত্তিতে অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আহ্বান জানায়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে টেলিফোন আলাপের পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশটিতে ‘আয়রন ডোম’ প্রেরণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ইসরায়েলের একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার মতে, এটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। কারণ, এর আগে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের ভূখণ্ডের বাইরে বিশ্বের অন্য কোথাও এই ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে মোতায়েন করা হয়নি। বর্তমানে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরানের পক্ষ থেকে ছোড়া কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের পাশাপাশি ইসরায়েলি বিমানবাহিনী দক্ষিণ ইরানে অবস্থান নেওয়া স্বল্প-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে সুনির্দিষ্ট সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল আরব আমিরাত বা উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশে সম্ভাব্য হামলা প্রতিহত করা এবং ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেওয়া। ফিলিস্তিন ইস্যু বা গাজা সংকট নিয়ে অতীতে দুই দেশের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকলেও, বর্তমান নিরাপত্তা সংকট তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক সমন্বয়কে নজিরবিহীন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ বা শান্তি চুক্তির পর এটিই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সবচেয়ে নিবিড় ও সক্রিয় পর্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে আরব আমিরাতের মাটিতে সরাসরি ইসরায়েলি সেনা মোতায়েনের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের জনমত এবং অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিপ্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। আমিরাতি কর্মকর্তাদের দাবি, ইরানের পক্ষ থেকে আসা ধারাবাহিক হুমকি দেশটির সাধারণ জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছে। আত্মরক্ষার তাগিদে যারা সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে, সাধারণ মানুষ তাদের ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করছে বলে তারা মনে করেন। অন্যদিকে, ইসরায়েল যখন নিজ ভূখণ্ডে নানামুখী যুদ্ধের মোকাবিলা করছে, তখন বিদেশে মূল্যবান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও দক্ষ সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নতুন বিতর্কের সূত্রপাত করতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক কর্মকর্তা তারেক আল-ওতাইবা এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, চরম সংকটের সময়ে ইসরায়েল কার্যকর সহায়তা প্রদানকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল। আমিরাতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইতালি এবং অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশি ইসরায়েলের ভূমিকাও তাদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আঞ্চলিক নিরাপত্তার এই নতুন সমীকরণ মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ও ক্ষমতার ভারসাম্যে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থানকে মূলত ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব ও সামরিক হুমকি মোকাবিলার একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অংশ হিসেবেই দেখছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। এই পদক্ষেপের ফলে ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো সামরিক বলয় তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।


