নগর ও পরিবেশ ডেস্ক
রাজধানী ঢাকায় গত দুই দিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টিপাত চললেও বাতাসের মানের আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। সাধারণত এপ্রিলের শেষভাগে এবং বৃষ্টি চলাকালীন বায়ুমান উন্নত থাকার কথা থাকলেও আজ মঙ্গলবার বৈশ্বিক বায়ুমান সূচকে (আইকিউএয়ার) ১২৪টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ষষ্ঠ। সকালের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাতাসের মান সূচক বা একিউআই স্কোর ১১৮ রেকর্ড করা হয়েছে, যা বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের মতো সংবেদনশীল গোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, টানা বৃষ্টিপাত বায়ুমণ্ডলের ভাসমান ধূলিকণা কমিয়ে দিলেও স্থানীয় দূষণকারী উৎসগুলো সচল থাকায় বায়ুমান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না। দুই কোটি মানুষের এই মেগাসিটিতে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারি পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে এখন জনমনে প্রশ্ন উঠছে। অতীতের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আট থেকে দশ বছর আগেও বর্ষণমুখর এই সময়ে বায়ুর মান বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি নির্মল থাকত।
আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ার-এর লাইভ তথ্য অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবার বৈশ্বিকভাবে দূষণের শীর্ষে অবস্থান করছে কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের রাজধানী কিনশাসা, যার স্কোর ১৯৬। বিশ্বজুড়ে অধিকাংশ প্রধান শহরের বায়ুমান আজ তুলনামূলক ভালো থাকলেও ঢাকার পরিস্থিতি ভিন্ন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত রোববার বিকেলে ৪২ মিলিমিটার এবং গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবুও বায়ুমান সূচক ১০০-এর উপরে থাকা নগরবাসীর জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) বিশেষজ্ঞরা বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় দূষণকারী উৎসগুলোকে দায়ী করছেন। তাঁদের মতে, বৃষ্টির কারণে রাস্তার ধূলিকণা সাময়িকভাবে কমলেও লক্কড়ঝক্কড় ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণযজ্ঞ বায়ুমানের স্থায়ী উন্নতির পথে প্রধান বাধা। বিশেষ করে ফিটনেসবিহীন গণপরিবহন ও ট্রাক থেকে নির্গত সালফার ও কার্বন কণা বৃষ্টির পানিতেও পুরোপুরি প্রশমিত হয় না। নগরীতে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অব্যবস্থাপনাও এই পরিস্থিতির জন্য সমানভাবে দায়ী।
চলতি বছরের শুষ্ক মৌসুমে ঢাকার বায়ুমান প্রায় প্রতিদিনই ‘অস্বাস্থ্যকর’ থেকে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ (একিউআই স্কোর ৩০০+) পর্যায়ে ছিল। বর্তমান স্কোর ১১৮ সেই তুলনায় কম মনে হলেও, এপ্রিলের শেষ ও বৃষ্টির আবহে একে মোটেও সন্তোষজনক বলা যায় না। সংশ্লিষ্টদের মতে, বৃষ্টির প্রাকৃতিকভাবে বাতাস পরিষ্কার করার ক্ষমতার চেয়েও দূষণের হার বর্তমানে অনেক বেশি।
আজ ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বায়ুমান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গুলশানের বে’জ এইজ ওয়াটার এবং বেচারাম দেউড়ী এলাকায় দূষণের মাত্রা সর্বোচ্চ ১৪৯ রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া গুলশান লেক পার্ক (১২৯), ধানমন্ডি (১২২) এবং বারিধারা পার্ক রোড (১১৯) এলাকায় বায়ুমান সংবেদনশীল মানুষের জন্য প্রতিকূল অবস্থায় রয়েছে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে বিশেষজ্ঞ এবং আইকিউএয়ার-এর পক্ষ থেকে কিছু সতর্কতামূলক পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বায়ুমান যখন সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য ক্ষতিকর থাকে, তখন বাইরে চলাচলের সময় মাস্ক ব্যবহার করা জরুরি। এছাড়া ঘরের বাইরে শারীরিক ব্যায়াম বা অধিক পরিশ্রমের কাজ পরিহার করা এবং দূষিত বাতাস প্রবেশ রোধে ঘরের জানালা বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে ঢাকার বায়ুমান উন্নত করতে হলে কেবল বৃষ্টির ওপর নির্ভর না করে দূষণের উৎসগুলো বন্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া অপরিহার্য।


