আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধ চলাকালীন তেহরানের প্রতি সহমর্মিতা ও সমর্থন প্রদর্শনের অভিযোগে ৬৯ জন ব্যক্তির নাগরিকত্ব বাতিল করেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাহরাইন। সোমবার দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বাহরাইনের উচ্চ ফৌজদারি আদালত (হাই ক্রিমিনাল কোর্ট) এই রায় প্রদান করেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ইরানের ‘শত্রুতাপূর্ণ ও অপরাধমূলক’ কার্যক্রমের প্রতি প্রকাশ্যে সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন এবং তেহরানের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেছেন। নাগরিকত্ব হারানো এই ব্যক্তিদের তালিকায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য রয়েছেন বলে জানা গেছে। মূলত জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা এবং বিদেশের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের দায়ে এই কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। এই সংকট নিরসনে চলতি বছরের ৬ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় কয়েক দফা আলোচনা হলেও তা কোনো ঐকমত্য ছাড়াই শেষ হয়। এর পরপরই ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান অভিমুখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান অভিযান শুরু হলে সংঘাত চূড়ান্ত রূপ নেয়।
যুদ্ধের সময় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ইরান মুহুর্মুহু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। বাহরাইনসহ সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমানে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনাগুলো এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল। ইরানের এই পাল্টা আক্রমণে মার্কিন সামরিক অবকাঠামোর পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেসামরিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে বাহরাইন ও কুয়েত এই হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং বেশ কিছু প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তার এই চরম অস্থিরতার সময়ে দেশের ভেতরে ইরানের পক্ষে অবস্থান নেওয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ড হিসেবে গণ্য করছে বাহরাইন সরকার। গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগে, মার্চ মাস থেকেই সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তখন থেকেই আটকদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়, যার চূড়ান্ত রায় হিসেবে গতকাল এই ৬৯ জনের নাগরিকত্ব বাতিলের আদেশ এলো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাহরাইনের এই পদক্ষেপটি কেবল একটি বিচারিক রায় নয়, বরং এটি প্রতিবেশী ইরানের প্রতি একটি কড়া কূটনৈতিক বার্তাও বটে। বাহরাইনের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ শিয়া মুসলিম হলেও দেশটির শাসক গোষ্ঠী সুন্নি মতাদর্শী। দীর্ঘ সময় ধরে বাহরাইন অভিযোগ করে আসছে যে, ইরান তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ এবং অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বাহরাইন সরকার জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে এখন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে।
নাগরিকত্ব বাতিলের এই প্রক্রিয়া বাহরাইনের আইনে একটি কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। এর ফলে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা রাষ্ট্রে প্রদত্ত সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন এবং দেশটিতে তাদের অবস্থান অবৈধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বাহরাইন ও ইরানের মধ্যকার বিদ্যমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


