অপরাধ ও আইন ডেস্ক
রাজধানীর উত্তরায় র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম এবং অমানবিক নির্যাতনের মাধ্যমে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে চতুর্থ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে। আজ সোমবার (৪ মে) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই বিচারিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, আজ একজন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হয়ে তার জবানবন্দি পেশ করবেন। এর আগে গত ২২ এপ্রিল এই মামলার তৃতীয় সাক্ষী মাসরুর আনোয়ার চৌধুরীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আসামিপক্ষ এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবীরা তাকে দীর্ঘ জেরা করেন। মাসরুর আনোয়ার চৌধুরীর জেরা সম্পন্ন হওয়ার পর আদালত পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আজকের দিনটি নির্ধারণ করেন।
এই মামলার প্রেক্ষাপট অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং স্পর্শকাতর। গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতাচ্যুত সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুম ও বিচারবহির্ভূত নির্যাতনের অসংখ্য অভিযোগ সামনে আসে। বিশেষ করে র্যাবের টিএফআই সেলে নিয়ে সাধারণ নাগরিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের দিনের পর দিন নিখোঁজ রাখা এবং সেখানে পদ্ধতিগত নির্যাতনের মাধ্যমে মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নজরে আনা হয়। প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নীতিমালার অংশ হিসেবে সুপরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো মানবতাবিরোধী অপরাধ।
গুমের এই আলোচিত মামলায় অভিযুক্ত ১৭ জনের মধ্যে ১০ জন বর্তমানে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে রয়েছেন। তাদের রাজধানীর ঢাকা সেনানিবাসের সাব-জেলে রাখা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের তালিকায় রয়েছেন র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম। এ ছাড়া উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন কর্নেল কেএম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে থাকা কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, র্যাবের গোয়েন্দা শাখার সাবেক পরিচালক কর্নেল মো. মশিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারওয়ার বিন কাশেম।
অন্যদিকে, মামলার প্রধান অভিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অপর ৭ জন বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। এই তালিকায় রয়েছেন শেখ হাসিনার সাবেক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, র্যাবের সাবেক দুই মহাপরিচালক এম খুরশীদ হোসেন ও ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ এবং র্যাবের সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. খায়রুল ইসলাম। পলাতক আসামিদের গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করার বিষয়ে ইতিপূর্বে ট্রাইব্যুনাল থেকে পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের ঘটনায় বিচার শুরু হওয়া বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক। দীর্ঘ সময় ধরে দেশে গুমের সংস্কৃতি বজায় থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত ছিল। এই মামলার কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখছে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা। তাদের মতে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যদি সুষ্ঠুভাবে অপরাধ প্রমাণিত হয়, তবে তা ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে বড় ধরনের উদাহরণ হিসেবে কাজ করবে। আজকের সাক্ষীর জবানবন্দি মামলার তদন্ত ও তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আদালত সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, বিচারিক নিয়ম মেনেই স্বচ্ছতার সাথে প্রতিদিনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিতেও বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আজকের কার্যক্রম শেষে আদালত পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ বা সংশ্লিষ্ট আদেশ প্রদান করবেন।


