সাংসদ ও মন্ত্রীদের জবাবদিহি নিশ্চিতে বিএনপির ‘মিনি সংসদ’

সাংসদ ও মন্ত্রীদের জবাবদিহি নিশ্চিতে বিএনপির ‘মিনি সংসদ’

রাজনৈতিক ডেস্ক

রাষ্ট্রীয় ও দলীয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনতে সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রীদের কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। এখন থেকে প্রতি তিন মাস অন্তর তৃণমূল নেতাদের উপস্থিতিতে এ ধরনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে মন্ত্রীরা তাদের কাজের খতিয়ান দেবেন এবং মাঠ পর্যায়ের নেতাদের প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন। গতকাল শনিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন (কেআইবি) মিলনায়তনে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বিএনপি এবং এর তিন সহযোগী সংগঠন— যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে আয়োজিত এই বিশেষ সভাটি অনেকটা জাতীয় সংসদের আদলে পরিচালিত হয়। উপস্থিত নেতাকর্মীরা একে ‘মিনি সংসদ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সভায় সরকারের ১০ জন মন্ত্রী তাদের গত ৮০ দিনের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, অবকাঠামোগত পরিকল্পনা এবং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অগ্রগতি তুলে ধরেন। তৃণমূল নেতারা নিজ নিজ এলাকার সমস্যা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার নিয়ে মন্ত্রীদের সরাসরি প্রশ্ন করেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে দলের নির্বাচনী ইশতেহারকে বর্তমানে ‘জনগণের ইশতেহার’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর এখন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের নতুন যুদ্ধ শুরু হয়েছে।” তিনি সাফ জানিয়ে দেন, দলীয় এমপি ও মন্ত্রীদের কেবল জাতীয় সংসদের কাছে নয়, তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছেও জবাবদিহি করতে হবে। এছাড়া সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে তৃণমূলের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় বজায় রাখার নির্দেশ দেন তিনি।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিশেষ বার্তা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে শুরু হতে যাওয়া উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও হিংসা দূর করার আহ্বান জানান। দলীয় মনোনয়ন বা প্রভাব খাটিয়ে কাউকে জিতিয়ে আনা হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, “কাজের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করেই নির্বাচিত হতে হবে।” এ সময় তিনি আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো প্রকার ছাড় না দেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে চেইন অব কমান্ড বা সাংগঠনিক শৃঙ্খলা জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিগত ১৭ বছরের বঞ্চনা ও বর্তমান সময়ের প্রত্যাশা নিয়ে নেতাদের প্রশ্নের জবাবে শীর্ষ পর্যায় থেকে জানানো হয়, টেন্ডার বা ঠিকাদারি কাজে অতীতের মতো কোনো লুটপাট বা অনিয়ম সহ্য করা হবে না। তবে নিয়ম মেনে সাধারণ নেতাকর্মী ও যোগ্য ঠিকাদাররা যাতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারেন, সেজন্য টেন্ডার প্রক্রিয়ার জটিলতা নিরসন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী পিরোজপুরের এক সাবেক নেতার অর্থ লোপাটের উদাহরণ টেনে সতর্ক করে বলেন, বিএনপি সরকারে এমন কোনো অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।

বৈঠকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের নাজুক অবস্থা পুনরুদ্ধারে বিশেষ পরিকল্পনা পেশ করেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা। আইনমন্ত্রী রাজনৈতিক মামলাগুলোর আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধানের আশ্বাস দেন। এছাড়া ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে সরকার জানায়, গণভোটসহ উচ্চকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠন এবং সংবিধানে বর্ণিত প্রতিটি পদক্ষেপ আক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে।

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, এই মতবিনিময় সভার উদ্দেশ্য হলো সরকারের কাজে স্বচ্ছতা আনা এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করা। তিন মাস অন্তর এ ধরনের আলোচনার মাধ্যমে সরকারের ভুলভ্রান্তি সংশোধন ও আগামীর কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় একদিকে যেমন সরকারের ওপর তৃণমূলের তদারকি বাড়বে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ