গণসংগীতশিল্পী কামরুদ্দীন আবসারের প্রয়াণ, সোমবার শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন

গণসংগীতশিল্পী কামরুদ্দীন আবসারের প্রয়াণ, সোমবার শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন

জাতীয় ডেস্ক

দেশের প্রখ্যাত গণসংগীতশিল্পী, গীতিকার ও সংগীত শিক্ষক কামরুদ্দীন আবসার গত শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল এবং তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কামরুদ্দীন আবসার দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। ২০১১ সালে প্রথমবার স্ট্রোক করার পর থেকে তিনি বাসাতেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তবে সম্প্রতি তার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। নিউমোনিয়া ও ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হলে গত ১৪ মে তাকে রাজধানীর একটি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী কবি ফেরদৌসী বেগম এবং এক সন্তানসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও সহযোদ্ধা রেখে গেছেন।

প্রয়াত এই শিল্পীর প্রতি সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আগামীকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত তার মরদেহ রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও প্রগতিশীল সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে এই শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বিকেলে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জানাজার সুনির্দিষ্ট স্থান ও সময় পরিবারের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে বলে জানা গেছে।

কামরুদ্দীন আবসার কেবল একজন কণ্ঠশিল্পীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমাজবদলের লড়াইয়ের এক সম্মুখ সারির সাংস্কৃতিক কর্মী। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেশের প্রগতিশীল লেখকসংগঠন ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’-এর কেন্দ্রীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি প্রগতিশীল ও সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্ম ‘গণসংস্কৃতি ফ্রন্ট’-এর একজন সক্রিয় সংগঠক এবং কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তার সুর ও বাণী ছিল অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।

তার সৃষ্টিশীলতার একটি বড় অংশজুড়ে ছিল গণসংগীত দল ‘সৃজন’। এই দলের মাধ্যমে তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে গণমানুষের গান গেয়েছেন এবং শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকারের কথা তুলে ধরেছেন। তার রচিত ও সুরারোপিত বহু গান বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র ও শ্রমিক আন্দোলনে কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করেছে।

কামরুদ্দীন আবসারের জীবনের অন্যতম গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় ছিল ২০০৬ সালের দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লাখনি রক্ষা আন্দোলন। বহুজাতিক কোম্পানির হাত থেকে দেশীয় সম্পদ রক্ষার সেই ঐতিহাসিক গণআন্দোলনে ‘গণসংস্কৃতি ফ্রন্ট’-এর পক্ষে তিনি অগ্রণী ও সাহসী ভূমিকা পালন করেন। মাঠপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের সংগঠিত করতে এবং গানের মাধ্যমে স্থানীয় আদিবাসী ও সাধারণ মানুষকে অধিকারসচেতন করতে তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তৎকালীন সময়ে তার গাওয়া গণসংগীতগুলো আন্দোলনকে বেগবান করতে রাজপথে জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা মনে করেন, কামরুদ্দীন আবসারের প্রয়াণে বাংলাদেশ একজন একনিষ্ঠ অধিকারকর্মী এবং শুদ্ধ ধারার গণসংগীতের সাধককে হারালো। পুঁজিবাদ ও স্বৈরাচারবিরোধী প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার গান ও সাংগঠনিক তৎপরতা এদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রগতিশীল সংস্কৃতির চর্চাকে পৌঁছে দিতে এবং গণসংগীতের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে তার সৃষ্টিকর্ম ও আদর্শ আগামী দিনেও অনুপ্রেরণা জোগাবে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ