আন্তর্জাতিক ডেস্ক
হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল সুরক্ষার অজুহাতে ফ্রান্স বা যুক্তরাজ্যের যেকোনো ধরনের সামরিক মোতায়েন এই কৌশলগত জলপথকে সামরিকীকরণের শামিল হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে ইরান তার কঠোর জবাব দেবে। রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি এই অবস্থান ব্যক্ত করেন।
উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী গরিবাবাদি স্পষ্ট করে বলেন, সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে এমন পক্ষগুলো যখন এই উদ্যোগ নেয়, যারা নিজেরাই অত্র অঞ্চলের সমস্যার অংশ হিসেবে বিবেচিত। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, হরমুজ প্রণালি একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর আঞ্চলিক জলপথ এবং এটি অঞ্চলের বাইরের কোনো শক্তির যৌথ সম্পত্তি নয়। ইরানের এই বক্তব্য মূলত এই অঞ্চলে পশ্চিমা শক্তির ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতার প্রতি একটি সরাসরি বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি নিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে, এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কেবল আঞ্চলিক দেশগুলোর, যেখানে বহিরাগত শক্তির উপস্থিতি কেবল অস্থিতিশীলতাই তৈরি করে।
এদিকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ কেনিয়ায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের এই উদ্বেগের প্রেক্ষিতে ভিন্ন অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান, ফ্রান্স কখনোই হরমুজ প্রণালিতে এককভাবে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা করেনি। বরং প্যারিস ইরানের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় বজায় রেখে একটি টেকসই সামুদ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গঠনের পক্ষে কাজ করতে আগ্রহী। মাখোঁর এই বক্তব্যকে উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।
তবে ফরাসি সশস্ত্র বাহিনীর সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ড এই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। চলতি সপ্তাহেই জানানো হয়েছিল যে, ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য মিশনের প্রস্তুতি হিসেবে একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ লোহিত সাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এই মোতায়েন মূলত হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌ চলাচল নিরাপদ রাখতে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের একটি যৌথ উদ্যোগের অংশ হতে পারে। এই খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পরই তেহরান তাদের কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালিতে পশ্চিমা যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি সবসময়ই তেহরানের জন্য একটি সংবেদনশীল বিষয়। ইরান মনে করে, এ ধরনের মোতায়েন তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ এবং পারস্য উপসাগরে তাদের আধিপত্য খর্ব করার প্রচেষ্টা। অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশগুলো ও তাদের মিত্ররা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর কথিত ইরানি হামলার আশঙ্কায় সামরিক টহল বাড়ানোর যুক্তি দিয়ে থাকে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের শান্তিমূলক বক্তব্য এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর সামরিক প্রস্তুতির মধ্যে এক ধরনের বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যদি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স এই জলপথে তাদের সামরিক উপস্থিতি জোরদার করে, তবে তা এই অঞ্চলের নিরাপত্তা সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলবে। ইরান ইতোমধ্যে তাদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সময় এই প্রণালিতে মহড়া পরিচালনা করেছে। ফলে উভয় পক্ষের অনড় অবস্থান ও পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক শান্তি রক্ষায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


