আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নৌচলাচল পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাহরাইনের যৌথ উদ্যোগে উত্থাপিত নতুন একটি খসড়া প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে চীন। বেইজিং প্রস্তাবটির মূল বিষয়বস্তু এবং এটি উত্থাপনের সময় নির্বাচনকে ‘অনুপযুক্ত’ বলে আখ্যায়িত করেছে। চীন স্পষ্ট জানিয়েছে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এ ধরনের একপেশে পদক্ষেপ সংকট সমাধানে কোনো ভূমিকা রাখবে না, বরং উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
জাতিসংঘে নিযুক্ত চীনের স্থায়ী রাষ্ট্রদূত ফু চং এক সাক্ষাৎকারে এই খসড়া প্রস্তাবের কার্যকারিতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, “আমরা মনে করি না যে এই প্রস্তাবের বিষয়বস্তু সঠিক, এমনকি এর জন্য নির্ধারিত সময়ও মোটেও উপযুক্ত নয়।” চীনা রাষ্ট্রদূতের মতে, এই জটিল ও সংবেদনশীল মুহূর্তে কোনো ‘জোড়াতালির প্রস্তাব’ পাস করা হলে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই মুহূর্তে প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত সব পক্ষকে কোনো পূর্বশর্ত ছাড়া আন্তরিক ও গঠনমূলক কূটনৈতিক আলোচনায় উৎসাহিত করা।
নিরাপত্তা পরিষদে জমা দেওয়া মার্কিন-বাহরাইনের এই যৌথ খসড়া প্রস্তাবে মূলত ইরানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এতে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে সামরিক হামলা, মাইন স্থাপন এবং অবৈধ টোল আদায়ের মতো কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করতে তেহরানের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের ধারণা, প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদে এটি ভোটাভুটির জন্য উত্থাপিত হলে পরাশক্তি চীন ও রাশিয়ার ভেটোর (স্থায়ী সদস্যদের বিশেষ veto ক্ষমতা) মুখে পড়ে তা বাতিল হয়ে যেতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো উল্লেখ করেছে, হরমুজ প্রণালির চলমান সংকট নিয়ে পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার এই বিভক্তি নতুন কিছু নয়। এর আগেও গত মাসে প্রায় একই ধরনের একটি মার্কিন সমর্থিত প্রস্তাবের বিরুদ্ধে চীন ও রাশিয়া যৌথভাবে ভেটো প্রয়োগ করেছিল। সে সময় বেইজিং ও মস্কোর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল যে, প্রস্তাবের ভাষা অত্যন্ত একপেশে এবং তা কেবল ইরানের ওপর এককভাবে দায় চাপানোর উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। উদ্ভূত সংকটের মূল কারণ এবং সামগ্রিক পটভূমিকে আড়াল করে এ ধরনের প্রস্তাব পাসের চেষ্টা জাতিসংঘের নিরপেক্ষ ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলে তারা দাবি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে বিশ্বরাজনীতির এই টানাপোড়েন বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশ্বের মোট সমুদ্রজাত জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামরিক বা কূটনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা এই নৌপথের সুরক্ষায় কঠোর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছে, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলো মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। চীনের এই দৃঢ় অবস্থানের ফলে খসড়া প্রস্তাবটি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও স্পষ্ট ও তীব্র হয়ে উঠল।


