আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কঠোর করতে একটি নতুন নীতিমালায় একমত হয়েছেন জোটের নীতিনির্ধারকেরা। নতুন এই ব্যবস্থার অধীনে আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়া বা বৈধ কাগজপত্রবিহীন অভিবাসীদের ইউরোপ থেকে সরাসরি তাদের নিজ দেশে কিংবা ইউরোপের বাইরে স্থাপিত বিশেষ প্রত্যাবাসন কেন্দ্রে পাঠানোর আইনি সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশন, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর এই সমঝোতা চূড়ান্ত হয়েছে।
সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ইউরোপের দেশগুলো থেকে যেসব বিদেশি নাগরিককে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, তাদের একটি বড় অংশই বাস্তবে ইউরোপ ছাড়েন না। আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এই বহিষ্কার আদেশগুলো কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছিল না। এই পরিস্থিতিতে অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং কার্যকর বহিষ্কার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে ইইউ নেতারা এই কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
নতুন প্রস্তাবনা অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিকের রাজনৈতিক আশ্রয় বা অন্য কোনো ক্যাটাগরির আবেদন চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যাত হলে অথবা ইউরোপে অবস্থানের বৈধ অনুমতি না থাকলে, সংশ্লিষ্ট দেশ তাৎক্ষণিকভাবে তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এক্ষেত্রে নতুন সংযোজন হলো ‘রিটার্ন হাব’ বা প্রত্যাবাসন কেন্দ্র। যদি কোনো কারণে কাউকে সরাসরি তার নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব না হয়, তবে তাকে ইউরোপের বাইরে কোনো তৃতীয় দেশে স্থাপিত বিশেষ প্রত্যাবাসন কেন্দ্রে পাঠানো যাবে।
পাশাপাশি, এই নীতিমালার অধীনে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত পারস্পরিকভাবে স্বীকৃত হবে। এর ফলে এক দেশে বহিষ্কারের আদেশ পাওয়া কোনো ব্যক্তি অন্য দেশে গিয়ে আত্মগোপন বা নতুন করে আবেদন করে বহিষ্কার এড়ানোর যে সুযোগ পেতেন, তা অনেকটাই সীমিত হয়ে আসবে। সমগ্র ইউরোপ জুড়ে একটি সমন্বিত ডাটাবেজ ও প্রশাসনিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই বহিষ্কার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হবে।
কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন নীতির এই পরিবর্তনকে ইউরোপের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম কঠোর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলোতে অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। ডানপন্থী ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান এবং জনমতের চাপের মুখে ইউরোপীয় নেতারা অভিবাসন ইস্যুতে আরও কড়া অবস্থান নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
ইউরোপের এই নীতিগত পরিবর্তন সেখানে বসবাসরত অনিয়মিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্তমানে ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি বসবাস করছেন। তাদের একটি বড় অংশ বৈধভাবে কর্মসংস্থান, ব্যবসা বা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, অনেকেরই এখনো কাগজপত্রসংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে কিংবা তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়ের (অ্যাসাইলাম) আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নীতিমালা পুরোপুরি কার্যকর হলে যাদের আশ্রয় আবেদন চূড়ান্তভাবে নাকচ হয়েছে, তারা আগের তুলনায় অনেক দ্রুত প্রশাসনিক নজরদারি ও আইনগত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার আওতায় চলে আসবেন। আগে যেখানে আপিল বা দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে ইউরোপে অবস্থান করা যেত, নতুন নিয়মে সেই সুযোগ সংকুচিত হবে। ফলে ইউরোপে অনিয়মিতভাবে অবস্থানকারী বাংলাদেশিদের জন্য বহিষ্কারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে।
অবশ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই নতুন উদ্যোগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র উদ্বেগ ও সমালোচনা প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার মতে, ইউরোপের বাইরে তৃতীয় কোনো দেশে প্রত্যাবাসন কেন্দ্র স্থাপন করে সেখানে অভিবাসীদের রাখা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের লঙ্ঘন হতে পারে। এটি অভিবাসীদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করবে এবং তাদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে বলে তারা দাবি করছেন।
তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর এই সমালোচনা নাকচ করে দিয়েছে ইউরোপীয় কমিশন। কমিশনের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, এই পদক্ষেপ কোনো বৈধ অভিবাসীর বিরুদ্ধে নয়। যাদের ইউরোপে থাকার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই, কেবল তাদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াটিকে সুশৃঙ্খল ও কার্যকর করতেই এই আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, নতুন এই নীতিমালা কার্যকর হলে ইউরোপের সামগ্রিক অভিবাসন ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে অনিয়মিত অভিবাসীদের ওপর প্রশাসনিক চাপ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতা আরও জোরদার হবে। এই পরিস্থিতিতে ফ্রান্সে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, যাদের কাগজপত্র বা বৈধতার বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে, তাদের দ্রুত পেশাদার আইনি সহায়তা নেওয়া এবং নিজেদের অবস্থান বৈধ করার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরি।


