আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে একটি দীর্ঘ খোলা চিঠি পাঠিয়ে সরাসরি মুখোমুখি বৈঠকে বসার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছেন। ১ হাজার ৮০০ শব্দেরও বেশি দীর্ঘ এই চিঠিতে জেলেনস্কি উল্লেখ করেছেন, তৃতীয় কোনো পক্ষের মধ্যস্থতা বা দীর্ঘ অপেক্ষার চেয়ে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি আলোচনার মাধ্যমেই কেবল টেকসই শান্তির পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি প্রস্তাবিত এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পুরো সময়জুড়ে উভয় পক্ষকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের এই সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব তাৎক্ষণিকভাবে নাকচ করে দিয়েছে ক্রেমলিন। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ নিশ্চিত করেছেন যে তারা প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির চিঠিটি পেয়েছেন এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে এ বিষয়ে বিস্তারিত অবহিত করা হবে। তবে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে পুরোনো অবস্থানের পুনরাবৃত্তি করে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আলোচনা করতে চাইলে যেকোনো সময় মস্কো সফর করতে পারেন। মূলত পূর্বশর্তহীন কোনো নিরপেক্ষ স্থানে শীর্ষ বৈঠকের প্রস্তাব রাশিয়া প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে, সেন্ট পিটার্সবার্গে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সঙ্গে এক আলাপকালে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানান, তিনি ইউক্রেনের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে প্রস্তুত, তবে এর জন্য উভয় পক্ষকেই নমনীয় হতে হবে এবং বাস্তবসম্মত সমঝোতার পথ খুঁজতে হবে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির এই চিঠির সময়কাল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চিঠিতে তিনি ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক মনোযোগের স্থানান্তরের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বৈদেশিক অগ্রাধিকারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি লিখেছেন, ওয়াশিংটন এখন সম্পূর্ণভাবে মধ্যপ্রাচ্য ও ইরান ইস্যুতে মনোযোগী। ফলে ইউরোপের এই যুদ্ধ আবারও মার্কিন প্রশাসনের মূল মনোযোগের কেন্দ্রে ফিরে আসা পর্যন্ত ইউক্রেনের অপেক্ষা করে থাকা সমীচীন হবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘ চার বছর ধরে চলা এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা কোনো পক্ষের জন্যই কল্যাণকর নয়।
চিঠির ভাষা যেমন ছিল কূটনৈতিকভাবে দৃঢ়, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে তা ছিল কড়া ও সমালোচনামূলক। ২৬ বছর ধরে রাশিয়ার ক্ষমতায় থাকা পুতিনের দীর্ঘ শাসনের প্রতি ইঙ্গিত করে জেলেনস্কি কিছুটা কটাক্ষের সুরে লিখেছেন, সময়ের পরিক্রমায় বয়সের স্বাভাবিক প্রভাব রুশ প্রেসিডেন্টের ওপর পড়তে শুরু করেছে। একই সঙ্গে তিনি সাম্প্রতিক সময়ে রুশ ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে এবং সেন্ট পিটার্সবার্গের মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক ফোরামের অনুষ্ঠান লক্ষ্য করে ইউক্রেনের সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি পুতিনকে মনে করিয়ে দেন যে, যুদ্ধ শুধু ইউক্রেনের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং রাশিয়ার অভ্যন্তরেও এর প্রভাব পড়ছে। চিঠির শেষাংশে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বলেন, “রুশ সেনাদের ভাগ্য নিয়ে আমাদের কোনো উদ্বেগ নেই, কিন্তু আমি আমার দেশের নাগরিকদের নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের মানুষ হারাচ্ছি, আর প্রতিটি মৃত্যু আমাদের জন্য চরম বেদনাদায়ক।”
যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনা দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির হয়ে থাকার প্রেক্ষাপটে জেলেনস্কির এই নতুন প্রস্তাবটি সামনে এলো। এর আগে জেনেভা, আবুধাবি এবং ইস্তাম্বুলে একাধিক দফায় শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও তা কোনো সুনির্দিষ্ট ও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধপরবর্তী আঞ্চলিক সীমানা নির্ধারণের প্রশ্নে দুই দেশই নিজ নিজ অবস্থানে অনড় রয়েছে।
ক্রেমলিনের দীর্ঘদিনের অনড় অবস্থান হলো, শান্তি আলোচনার প্রাথমিক শর্ত হিসেবে ইউক্রেনকে তাদের আংশিক দখলে থাকা চার অঞ্চল—দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়া থেকে সম্পূর্ণভাবে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে হবে এবং পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোতে (NATO) যোগদানের সব ধরনের প্রচেষ্টা স্থায়ীভাবে পরিত্যাগ করতে হবে। অপরদিকে, ইউক্রেন সরকার ও দেশটির জনগণ রাশিয়ার এই শর্ত শুরু থেকেই তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। কিয়েভের সুস্পষ্ট অবস্থান হলো, আগ্রাসনকারীদের কাছে নিজেদের সার্বভৌম ভূখণ্ড বা কোনো অংশ ছেড়ে দিলে তা ভবিষ্যতে রাশিয়ার পক্ষ থেকে আরও বড় ধরনের আগ্রাসনের পথ উন্মুক্ত করে দেবে। ইউক্রেনীয় নীতিনির্ধারকেরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ২০১৪ সালে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া দ্বীপপুঞ্জ অবৈধভাবে দখলের পর আন্তর্জাতিক মহলের শিথিল প্রতিক্রিয়ার সুযোগ নিয়েই ২০২২ সালে রাশিয়া পূর্ণমাত্রায় সামরিক অভিযান শুরু করেছিল।
এদিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই চিঠি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, দুই নেতার মধ্যে এমন একটি শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে তা হবে অত্যন্ত চমৎকার। তিনি উল্লেখ করেন, দুই পক্ষকেই একটি টেকসই সমাধানে পৌঁছাতে হলে কিছু ক্ষেত্রে সমঝোতা করতে হবে। তবে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধক্ষেত্রের বর্তমান পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রশ্নে দুই দেশের বিপরীতমুখী অনড় অবস্থানের কারণে অদূর ভবিষ্যতে সুইজারল্যান্ড বা তুরস্কের মতো কোনো নিরপেক্ষ তৃতীয় দেশে এই ধরনের শীর্ষ বৈঠক বাস্তবায়নের সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।


