আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের বিচার বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া একটি ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন এখন মূলধারার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশের প্রধান বিচারপতির এক মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামক একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট মাত্র পাঁচ দিনে এক কোটির বেশি অনুসারী পেয়েছে, যা ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টের অনুসারী সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক এই প্রতীকী আন্দোলনটি বর্তমানে ভারতের তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ, ব্যঙ্গ এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদের এক নতুন মাধ্যম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের তথ্যানুযায়ী, সম্প্রতি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামক অ্যাকাউন্টটি এক কোটি অনুসারীর মাইলফলক স্পর্শ করে, যা দ্রুতই দেড় কোটি অতিক্রম করে। বিপরীতে, বিজেপির অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে অনুসারী সংখ্যা প্রায় ৮৭ লাখ এবং প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের অনুসারী সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৩২ লাখ। মাত্র ৫৬টি পোস্টের মাধ্যমে এই প্ল্যাটফর্মটির এমন দ্রুত উত্থান ভারতের ডিজিটাল রাজনীতিতে একটি নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে বিজেপি দীর্ঘ সময় ধরে ১৮ হাজারেরও বেশি পোস্টের মাধ্যমে তাদের অনুসারী ভিত্তি তৈরি করেছে।
এই ঘটনার সূত্রপাত গত ১৫ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি উন্মুক্ত শুনানির মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত দেশের যুবসমাজের একটি অংশের কর্মহীনতা ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে গিয়ে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেন। তিনি উল্লেখ করেন, কিছু তরুণ কোনো কর্মসংস্থান না পেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা তথ্য অধিকার কর্মী হিসেবে অন্যদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আক্রমণ করছে। শীর্ষ আদালতের পক্ষ থেকে তরুণদের প্রতি এমন মন্তব্য দেশটির নতুন প্রজন্মের (জেন জি) মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের জন্ম দেয়।
এই মন্তব্যের প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্মী অভিজিৎ দিপকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রশ্ন তোলেন এবং ক্ষমতাসীন দলের নামকরণের আদলে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ বা ‘সিজেপি’ নামের ওয়েবসাইট ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে এটিকে কেবল একটি মিম বা ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা মনে করা হলেও, সাধারণ তরুণদের ব্যাপক সাড়ায় এটি দ্রুত একটি সংগঠিত ডিজিটাল আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনের উদ্যোক্তাদের মতে, যিনি নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করবেন, তাঁর কাছ থেকেই এমন নেতিবাচক তুলনা আসায় তরুণ সমাজ বেশি আঘাত পেয়েছে।
সমালোচনার মুখে পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন। তিনি দাবি করেন, তাঁর বক্তব্যকে ভুলভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি মূলত সাধারণ তরুণদের লক্ষ্য করে নয়, বরং ভুয়া সনদ ব্যবহারকারীদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে গিয়ে ওই মন্তব্য করেছিলেন।
এই প্রতীকী আন্দোলনটি কেবল তরুণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং ভারতের সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশটির সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র, কীর্তি আজাদ এবং প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণসহ অনেকেই এই উদ্যোগের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা কেবল ব্যঙ্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে, দেশের বর্তমান কর্মসংস্থান সংকট ও শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে জবাবদিহি চাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।
সাবেক আমলারাও এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় যেখানে মুক্ত আলোচনার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে, সেখানে এই ধরনের ব্যঙ্গাত্মক ও অহিংস প্রতিবাদ তরুণদের ক্ষোভ প্রকাশের একটি বিকল্প ও কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এই আন্দোলন প্রমাণ করে যে, আধুনিক যুগে সনাতন রাজনৈতিক প্রচারণার বাইরে গিয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে তরুণ সমাজ অত্যন্ত দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিজেদের দাবি ও অসন্তোষ তুলে ধরতে সক্ষম।


