অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের বর্তমান রপ্তানি আয় ৫০ থেকে ৫৫ বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি থেকে ১৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি জানিয়েছেন, সম্ভাবনাময় কয়েকটি খাতকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, নীতিগত সহায়তা, গবেষণা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে পারলে এই বিশাল লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন নয়।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় বেসরকারি খাতগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা মূল্যায়ন গবেষণা’ শীর্ষক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত প্রকল্পের ডিপিপি উপস্থাপন ও কনসালটেশন কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ সব কথা বলেন। তবে কোন কোন খাতে ঠিক কতদিনের মধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা বা সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি।
বাণিজ্যমন্ত্রী এমন এক সময়ে রপ্তানি বৃদ্ধির এই লক্ষ্যমাত্রার কথা উল্লেখ করলেন, যখন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী অর্থনৈতিক সংকটে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি খাত কঠিন সময় পার করছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের ১১ মাসের (জুলাই-মে) হিসাবে রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ঋণাত্মক ধারায় রয়েছে। তথ্যমতে, আলোচ্য সময়ে রপ্তানি আয় ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৮০ কোটি ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪ thousand ৪৯৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার।
এই বাস্তবতায় বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সব শর্ত পূরণ করেছে। তবে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী মূল চ্যালেঞ্জ হলো বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এবং পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করা। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের শিল্পখাতে কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং আধুনিক প্রযুক্তির অভিযোজনের ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে।
কর্মশালায় ‘এক্সপোর্ট কমপিটিটিভনেস ফর জবস’ (ইসিফোর-জে) প্রকল্পের উদাহরণ টেনে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, প্রকল্পের মূল ধারণা সময়োপযোগী হলেও বাংলাদেশে প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান দুর্বলতা। ভবিষ্যতে যেকোনো প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
দেশের শিল্প খাতের আধুনিকায়নের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, চামড়া ও হালকা প্রকৌশল খাতে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত অবকাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র হিসেবে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও পরিচালনা কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে, যা দেশীয় শিল্পকে দ্রুত বৈশ্বিক মানদণ্ডে পৌঁছাতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি পাট খাতের বিপুল সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কাঁচা পাট রপ্তানির তুলনায় বহুমুখী ও মূল্য সংযোজিত পাটপণ্য এবং পাটভিত্তিক ফেব্রিক উৎপাদনে বহুগুণ বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এ খাতে গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের লক্ষ্যে চীনের সঙ্গে যৌথ গবেষণা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন গড়ে তোলাই মন্ত্রণালয়ের মূল লক্ষ্য। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত সহায়তা সহজ করার বিষয়ে সরকার কাজ করছে।
কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান খান জানান, এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং দেশের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও আর্থিক অনুদান নিশ্চিত করা হবে। কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক। বক্তারা মনে করেন, সঠিক সময়ে সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত ও এর যথাযথ বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ২০২৬ পরবর্তী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের চ্যালেঞ্জ কতটুকু সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারবে।


