বেপজার বিনিয়োগে চীনা প্রাধান্য: উচ্চপ্রযুক্তি ও বৈচিত্র্যময় শিল্পে আগ্রহ

বেপজার বিনিয়োগে চীনা প্রাধান্য: উচ্চপ্রযুক্তি ও বৈচিত্র্যময় শিল্পে আগ্রহ

অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক

বাংলাদেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকাগুলোতে (ইপিজেড) বিদেশি বিনিয়োগের নতুন ধারায় চীনের একক আধিপত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অধীনে আসা মোট বিনিয়োগের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এসেছে চীন থেকে। চীনের একক মালিকানাধীন অথবা যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত কোম্পানিগুলোর এই ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ দেশের শিল্পায়নের রূপরেখায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বেপজা মোট ৩৬টি কোম্পানির সঙ্গে জমি ইজারার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর মাধ্যমে মোট ৭১ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব নিশ্চিত হয়েছে। উল্লিখিত ৩৬টি কোম্পানির মধ্যে ২৩টিই চীনা প্রতিষ্ঠান অথবা চীনের সঙ্গে যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানি। এই ২৩টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আসা বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৪৯ কোটি ৮৮ লাখ ডলার, যা সামগ্রিক বিনিয়োগের বিশাল একটি অংশ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনা বিনিয়োগের ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘকাল ধরে চীনা উদ্যোক্তারা মূলত বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও, বর্তমানে তারা উচ্চ মূল্যের এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত শিল্পখাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর, ড্রোন প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস পণ্য, উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম, জুতো উৎপাদন, প্যাকেজিং শিল্প এবং আধুনিক কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে চীনা বিনিয়োগের এই নতুন ঝোঁক দেশের রপ্তানি ঝুড়িতে পণ্য বৈচিত্র্য আনয়ন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বেপজার নির্বাহী পরিচালক (জনসংযোগ) এএসএম আনোয়ার পারভেজ জানান, চীনে আয়োজিত বিভিন্ন বিনিয়োগ সেমিনার এবং বাংলাদেশের ইপিজেডগুলোর অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ এই বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। বিনিয়োগকারী বান্ধব সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়েছে।

গত ২২ থেকে ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন দুয়ার উন্মোচন করেছে। ওই সফরের ধারাবাহিকতায় বাগেরহাটের মোংলা এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চীনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া কেরানীগঞ্জে চীনা প্রতিষ্ঠান ‘হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজ’ তাদের দ্বিতীয় কারখানা স্থাপনে ২২ কোটি ডলারের বিনিয়োগ করছে, যা স্থানীয় পর্যায়ে প্রায় ১৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকালীন বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর আরও ১২টি চীনা কোম্পানি ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব পেশ করেছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রাপ্ত এই বিশাল বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলোকে দ্রুততম সময়ে বাস্তব রূপ দেওয়াই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন সম্প্রতি এক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনার পর বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের ওপর চীনা কোম্পানিগুলোর আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পে ইতোমধ্যে ৩০টিরও বেশি কোম্পানি প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

চীনা বিনিয়োগকারীদের আরও কার্যকর সেবা প্রদানের লক্ষ্যে বিডা এরই মধ্যে বিশেষ ‘চায়না ডেস্ক’ চালু করেছে। একইসঙ্গে চীনা ভাষায় একটি পোর্টাল এবং আগামী তিন মাসের মধ্যে চীনের গানঝৌতে বিডার একটি অফিস খোলার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, এই পদক্ষেপগুলো চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরতাকে আরও সুসংহত করবে এবং বাংলাদেশের শিল্প খাতে উচ্চপ্রযুক্তির স্থানান্তরকে ত্বরান্বিত করবে।

সরকারের এই সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা কেবল কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেই নয়, বরং রপ্তানি বাণিজ্যে চীনের মতো বৈশ্বিক অর্থনীতির পরাশক্তির অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের শিল্প প্রবৃদ্ধিকে একটি টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিয়ে যাবে।

(তথ্যসূত্র: সরকারি পরিসংখ্যান এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।)

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ