সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতির আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতির আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

জাতীয় ডেস্ক

জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আদর্শিক মতভিন্নতা স্বাভাবিক হলেও সংসদীয় রাজনীতিতে কোনো ধরনের শত্রুতার স্থান নেই। বুধবার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এই ঐক্যের ডাক দেন। সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির অবসানের ইঙ্গিত দিয়ে ন্যায়পরায়ণতার ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “সংসদের রীতি অনুযায়ী আমাদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকবে, তবে শত্রুতা নয়। প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের পরিবর্তে দেশে ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠিত হবে।” গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধনে মতের অমিলকে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে বরং গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের আহ্বান জানান তিনি।

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন। বিশেষ করে বিগত সময়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খাতে সৃষ্ট অস্থিরতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশ যেন আর কখনোই ফ্যাসিবাদের কবলে না পড়ে এবং তাঁবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত না হয়। এই লক্ষ্যে সকল রাজনৈতিক দলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই প্রশ্নে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে জাতীয় ঐক্য অটুট থাকা জরুরি।

বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রসঙ্গ। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, দীর্ঘকাল ধরে দুর্নীতি ও দুঃশাসনের প্রভাবে শুধু রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ক্ষতিই হয়নি, বরং এর প্রভাব পড়েছে সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের ওপর। রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যে নৈতিক স্খলন দেখা দিয়েছে, তা উত্তরণের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

নৈতিকতা ও মূল্যবোধের গুরুত্বারোপ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দুর্নীতি ও ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে শুধু রাজনীতি বা অর্থনীতিই নয়, বরং আমাদের ধর্মীয়, সামাজিক, সংস্কৃতি এবং পারিবারিক মূল্যবোধেরও অবক্ষয় ঘটেছে। এই মূল্যবোধকে যেকোনোভাবেই হোক আমাদের ফিরিয়ে আনতে হবে।” তিনি বিশেষত পারিবারিক মূল্যবোধ পুনঃস্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যা একটি সুস্থ সমাজ গঠনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

সংসদে মূল্যবোধের চর্চা এবং শিশুকালের শিক্ষার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি—আমাদের এই ছোটবেলার মূল্যবোধকে যেকোনো মূল্যে এই সংসদে ফিরিয়ে আনতে হবে।” তার মতে, দেশ গঠনের মূল চালিকাশক্তি হলো নৈতিকতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা। আইনসভার সদস্যদের আচরণের মধ্য দিয়েই সেই দৃষ্টান্ত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে স্পষ্ট করেন যে, একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পূর্বশর্ত হলো দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং পরমতসহিষ্ণুতা। সরকারি ও বিরোধী দল যদি জাতীয় স্বার্থে অভিন্ন অবস্থানে আসতে পারে, তবেই দীর্ঘমেয়াদে দেশের উন্নয়ন টেকসই হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি দূর করে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমেই কেবল ফ্যাসিবাদ ও তাঁবেদারি মানসিকতার মূলোৎপাটন করা সম্ভব।

বাজেট অধিবেশনের এই সমাপনী বক্তব্যকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। বিশেষ করে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বান রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে কতটা প্রভাব ফেলে, তা এখন দেখার বিষয়। সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার এই সংহতির বার্তা বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পরিশেষে, তারেক রহমান সংসদ সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে এবং দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে জনপ্রতিনিধিদের আরও সচেতন ও মূল্যবোধসম্পন্ন হতে হবে। সংসদের এই ঐক্যের আহ্বান সফল হলে তা ভবিষ্যতের বাংলাদেশ বিনির্মাণে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ